CLASS NO: 04
নিউক্লিয়াস (Nucleus)
নিউক্লিয়াস কাকে বলে?
ইউক্যারিওটিক কোশের প্রোটোপ্লাজমের সবচেয়ে ঘন, প্রায় গোলাকার, লিপিড ও প্রোটিন দিয়ে তৈরি দুটি একক পর্দা দিয়ে ঢাকা যে অংশ বংশগত পদার্থ বা DNA বহন করে এবং কোশের যাবতীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে নিউক্লিয়াস বলে।
- ল্যাটিন কথায় নিউক্লিয়াসের অর্থ হল শাঁস।
- বিজ্ঞানী রবার্ট ব্রাউন (Robert Brown, 1831) সর্বপ্রথম নিউক্লিয়াস আবিষ্কার ও নামকরণ করেন।
নিউক্লিয়াসের রাসায়নিক উপাদান
- 9-12% DNA
- 15% হিস্টোন (বেসিক) প্রোটিন
- 5% RNA
- প্রায় 65% আম্লিক ও প্রশমিত প্রোটিন এবং খনিজ আয়ন (যেমন- Ca²⁺, K⁺, Na⁺)
নিউক্লিয়াসের গঠন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো
আদর্শ নিউক্লিয়াস চারটি অংশ নিয়ে গঠিত:
- নিউক্লিয় পর্দা (Nuclear membrane)
- নিউক্লিওপ্লাজম (Nucleoplasm)
- নিউক্লিয় জালিকা (Nuclear reticulum/Chromatin network)
- নিউক্লিওলাস (Nucleolus)
1. নিউক্লিয় পর্দা (Nuclear Membrane):
- নিউক্লিয়াসকে সাইটোপ্লাজম থেকে পৃথক রাখে।
- দুটি একক পর্দার অন্তর্বর্তী স্থানকে পেরিনিউক্লিয়ার সিস্টারনি বলে।
- পর্দার স্থানে স্থানে সূক্ষ্ম ছিদ্র (নিউক্লিয়ার পোর) থাকে, যার মাধ্যমে নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজমের সংযোগ বজায় থাকে।
- কাজ:
- (i) নিউক্লিয়াসের আকৃতি প্রদান
- (ii) নিউক্লিয়ার রন্দ্রের মাধ্যমে সংযোগ রক্ষা
- (iii) নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজমকে পৃথক রাখা
2. নিউক্লিওপ্লাজম (Nucleoplasm):
- নিউক্লিয় পর্দা বেষ্টিত নিউক্লিয়াসের মধ্যে স্বচ্ছ, ঈষৎ আম্লিক, অর্ধতরল, সূক্ষ্ম দানাযুক্ত ধাত্রবস্তু।
- এতে নিউক্লিওপ্রোটিন, উৎসেচক, জৈব ও অজৈব পদার্থ (Na, Ca, P, Mg, K) থাকে।
- কাজ: নিউক্লিয়াসের ধাত্ররূপে কাজ করে, অন্যান্য অংশ ধারণ করে।
3. নিউক্লিয় জালিকা (Nuclear reticulum/Chromatin network):
- নিউক্লিওপ্লাজমে ভাসমান নিউক্লিয় প্রোটিন দ্বারা নির্মিত সূত্রাকার জালক।
- কোশ বিভাজনের সময় এই জালিকা থেকে ক্রোমোজোম সৃষ্টি হয়।
- ক্রোমোজোমে জিন (Gene) থাকে, যা বংশগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে।
- ক্রোমাটিন দুই প্রকার— (i) হেটারোক্রোমাটিন (ii) ইউক্রোমাটিন।
- কাজ:
- (i) কোশবিভাজনের সময় ক্রোমোজোম গঠন
- (ii) বংশগত পদার্থ DNA বহন
4. নিউক্লিওলাস (Nucleolus):
- নিউক্লিয়াসের সবচেয়ে ঘন, উজ্জ্বলভাবে রঞ্জিত, গোলাকার বা উপবৃত্তাকার গঠন।
- RNA ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত।
- সাধারণত একটি নিউক্লিয়াসে একটিই নিউক্লিওলাস থাকে।
- নিউক্লিওলাসে চারটি অঞ্চল:
- (i) গ্রানিউলার (দানাদার)
- (ii) ফাইব্রিলার (সূত্রাকার)
- (iii) অ্যামরফাস (অনিয়তাকার)
- (iv) অন্তঃ ও বহিঃ নিউক্লিয়ার ক্রোমাটিন
- কাজ:
- (i) নিউক্লিওপ্রোটিনের সঞ্চয়
- (ii) RNA উৎপাদন ও প্রোটিন সংশ্লেষে অংশগ্রহণ
নিউক্লিয়াসের কাজগুলি আলোচনা করো
- বিপাকীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ: উৎসেচক সংশ্লেষের মাধ্যমে কোশের যাবতীয় বিপাকীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এজন্য নিউক্লিয়াসকে 'কোশের মগজ' (Brain of the Cell) বলে।
- বংশগত তথ্যের ভান্ডার: নিউক্লিয়াসে জীবদেহের বংশগত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষিত থাকে।
- RNA সংশ্লেষ: নিউক্লিওলাসে RNA সংশ্লেষ ঘটে।
- কোশবিভাজন: কোশবিভাজনে নিউক্লিয়াস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- বংশগত বৈশিষ্ট্যের সঞ্চারণ: নিউক্লিয়াসের DNA-এর মাধ্যমে জীবের বংশগত বৈশিষ্ট্য এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়।
- প্রকরণ বা ভেদ সৃষ্টি: নিউক্লিয়াসস্থিত ক্রোমোজোমের গঠন ও সংখ্যার পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকরণ সৃষ্টি হয়।
নিউক্লিয়াসের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে কোশের শ্রেণিবিভাগ
- ইনিউক্লিয়েট (Enucleate): নিউক্লিয়াসবিহীন কোশ (যেমন— স্তন্যপায়ীর লোহিত রক্তকণিকা, উদ্ভিদের ফ্লোয়েমের সিভনল কোশ)
- মনোনিউক্লিয়েট (Mononucleate): একক নিউক্লিয়াসযুক্ত কোশ
- বাইনিউক্লিয়েট (Binucleate): দুটি নিউক্লিয়াসযুক্ত কোশ (যেমন— প্যারামেসিয়াম)
- মাল্টিনিউক্লিয়েট (Multinucleate): বহু নিউক্লিয়াসযুক্ত কোশ (উদ্ভিদকোশ সিনোসাইট, প্রাণীকোশ সিনসাইটিয়াল)
সেন্ট্রাল ডগমা (Central Dogma)
DNA → (রেপ্লিকেশন) → DNA
DNA → (ট্রান্সক্রিপশন) → RNA
RNA → (ট্রান্সলেশন) → প্রোটিন
RNA → (রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন) → DNA
মাইটোকনড্রিয়া (Mitochondria)
মাইটোকনড্রিয়া কাকে বলে?
সজীব কোশের (বিশেষত ইউক্যারিওটিক কোশ) নিউক্লিয়াসবিহীন সাইটোপ্লাজমে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা, লিপিড ও প্রোটিন নির্মিত দ্বি-একক পর্দাবেষ্টিত গোলাকার, ডিম্বাকার অথবা সূত্রাকার অঙ্গাণু, যা সবাত শ্বসনে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে এবং কোশের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপন্ন করে, তাদের মাইটোকনড্রিয়া বলে।
- বিজ্ঞানী কলিকার (Kolliker, 1850) মাইটোকনড্রিয়া আবিষ্কার করেন।
- বিজ্ঞানী বেন্ডা (Benda, 1897) 'মাইটোকনড্রিয়া' নামকরণ করেন।
মাইটোকনড্রিয়ার গঠন সম্পর্কে ধারণা দাও
1. দ্বি-একক পর্দা:
- (i) বহিঃপর্দা (Outer membrane): 60-70Å পুরু, মসৃণ।
- (ii) অন্তঃপর্দা (Inner membrane): 60-70Å পুরু, অমসৃণ।
দুটি পর্দার মাঝখানের দূরত্ব 60-80Å।
2. প্রকোষ্ঠ:
- (i) বহিঃপ্রকোষ্ঠ: বহিঃ ও অন্তঃপর্দার মাঝখানের স্থান (Perimitochondrial space)।
- (ii) অন্তঃপ্রকোষ্ঠ: অন্তঃপর্দা দ্বারা আবিষ্ট প্রকোষ্ঠ।
3. ধাত্র (Matrix):
- অন্তঃপ্রকোষ্ঠ ধাত্র দ্বারা পূর্ণ থাকে।
- ধাত্রে 2-6টি নগ্ন, চক্রাকার DNA, tRNA, RNA, 55S রাইবোজোম, প্রোটিন ও বিভিন্ন উৎসেচক থাকে।
4. ক্রিস্টি (Cristae):
- অন্তঃপর্দা কোশের ভিতরের দিকে ভাঁজ হয়ে আঙুলের মতো প্রবর্ধক সৃষ্টি করে, যাকে ক্রিস্টি বলে।
- প্রতিটি ক্রিস্টির গায়ে বৃত্তযুক্ত দানা (F₁ বস্তু/অধঃএকক) থাকে।
5. গ্রানিউলস দানা (Granules):
- বহিঃপর্দার বহির্ভাগে 60Å রাইবোজোম বিশিষ্ট ক্ষুদ্র দানা থাকে, যাকে পারসনের উপএকক বলে।
মাইটোকনড্রিয়ার কাজগুলি লেখো
- সবাত শ্বসন: ধাত্র ও পর্দাস্থিত উৎসেচকের সাহায্যে খাদ্যবস্তুর সম্পূর্ণ জারণ ঘটায় ও শক্তির মুক্তি ঘটে।
- কোশের শক্তিঘর: সবাত শ্বসনে ক্রেবস চক্রের মাধ্যমে ATP উৎপাদন হয়। এজন্য মাইটোকনড্রিয়াকে 'কোশের শক্তিঘর' (Powerhouse of the Cell) বলে।
- জৈব অণু সংশ্লেষ: সাইটোক্রোম, ক্লোরোফিল, পিরিমিডিন, স্টেরয়েড প্রভৃতি জৈব অণু সংশ্লেষের জন্য উপাদান সরবরাহ।
- কুসুম উৎপাদন: ডিম্বাণুতে কুসুম (Yolk) উৎপাদনে সাহায্য করে।
- ফ্যাটি অ্যাসিড বিপাক: মাইটোকনড্রিয়াতে ফ্যাটি অ্যাসিডের β-জারণ ঘটে।
- অ্যামিনো অ্যাসিড সংশ্লেষ: কিটোগ্লুটারিক অ্যাসিড থেকে গ্লুটামিক অ্যাসিড, অক্সালোঅ্যাসিটিক অ্যাসিড থেকে অ্যাসপারটিক অ্যাসিড সংশ্লেষিত হয়।
প্লাস্টিড (Plastid)
প্লাস্টিড কাকে বলে? প্লাস্টিডের প্রকারভেদগুলি আলোচনা করো
প্রধানত উদ্ভিদকোশে ও সালোকসংশ্লেষকারী প্রোটিস্টান কোশে দ্বি-একক পর্দাবৃত, গোলাকার, ডিম্বাকার বা সূত্রাকার বৃহত্তম কোশীয় অঙ্গাণু, যা খাদ্য সংশ্লেষ ও খাদ্য সঞ্চয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, তাকে প্লাস্টিড বলে।
- বিজ্ঞানী ই. হেকেল (E. Haeckel, 1866) সর্বপ্রথম 'প্লাস্টিড' শব্দটি ব্যবহার করেন।
প্লাস্টিডের প্রকারভেদ:
রঞ্জকের উপস্থিতি ও কাজ অনুযায়ী প্লাস্টিডকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়:
- ক্লোরোপ্লাস্টিড (Chloroplast)
- ক্রোমোপ্লাস্টিড (Chromoplast)
- লিউকোপ্লাস্টিড (Leucoplast)
প্লাস্টিডের প্রকারভেদগুলি আলোচনা করো
1. ক্লোরোপ্লাস্ট (Chloroplast)
- সবুজ রঙ্গকযুক্ত প্লাস্টিড।
- দুটি পুরু একক পর্দাবেষ্টিত।
- ক্লোরোপ্লাস্টের মধ্যে রাইবোজোম ও স্ট্রোমা (ধাত্র) থাকে।
- স্ট্রোমার মধ্যে চাকতির মতো অংশ থাকে, যাকে থাইলাকয়েড বলে। থাইলাকয়েডের ভিতরে ক্লোরোফিল থাকে। কয়েকটি থাইলাকয়েড একত্রে গ্রানা গঠন করে।
- কাজ: সূর্যালোক শোষণ করে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে এবং শর্করাজাতীয় খাদ্য তৈরি করে।
- অবস্থান: উদ্ভিদের সবুজ অংশে (পাতা, ফুলের বৃতি, সবুজ কাণ্ড ইত্যাদি)।
2. ক্রোমোপ্লাস্ট (Chromoplast)
- সবুজ বাদে অন্য বর্ণের রঙ্গকযুক্ত প্লাস্টিড।
- ধাত্রে নানা বর্ণের রঙ্গক পদার্থ থাকে (হলুদ-জ্যান্থোফিল, কমলা-ক্যারোটিন, লাল-ফাইকোএরিথ্রিন, নীলাভ-সবুজ-ফাইকোসায়ানিন)।
- দ্বি-একক পর্দাবেষ্টিত, গোলাকার, দণ্ডাকার বা তারকাকার।
- কাজ: ফুল ও ফলকে বর্ণময় করে, পরাগ সংযোগে সাহায্য করে।
- অবস্থান: ফুলের পাপড়ি, পাকা ফলের ত্বক।
3. লিউকোপ্লাস্ট (Leucoplast)
- রঙ্গকবিহীন, বর্ণহীন প্লাস্টিড।
- দ্বি-একক পর্দাবেষ্টিত, গোলাকার, ডিম্বাকার, দণ্ডাকার।
- কাজ: খাদ্য সঞ্চয় (শ্বেতসার, প্রোটিন, ফ্যাট)।
- প্রকারভেদ:
- অ্যামাইলোপ্লাস্ট (শ্বেতসার সঞ্চয়কারী)
- প্রোটিনোপ্লাস্ট (প্রোটিন সঞ্চয়কারী)
- এলাইওপ্লাস্ট (ফ্যাট সঞ্চয়কারী)
- অবস্থান: মূলের কোশ, ভূনিম্নস্থ কাণ্ড।
ধন্যবাদ