CLASS NO: 03
সাইটোপ্লাজম (Cytoplasm)
সাইটোপ্লাজম কী?
সজীব কোশে কোশপর্দা থেকে নিউক্লিয়পর্দা পর্যন্ত বিস্তৃত অংশে যে অর্ধস্বচ্ছ, দানাদার, কোলয়েড প্রকৃতির জেলির মতো তরল পদার্থ উপস্থিত থাকে, তাকে সাইটোপ্লাজম (Cytoplasm; Kytos = ফাঁপা, plasma = গঠন) বলে।
- বিজ্ঞানী কলিকার (Kolliker, 1862) সর্বপ্রথম 'সাইটোপ্লাজম' শব্দটি ব্যবহার করেন।
- সাইটোপ্লাজমে বিভিন্ন ম্যাক্রো উপাদান (কার্বন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেন) এবং মাইক্রো উপাদান (কপার, কোবাল্ট, জিংক, সিলিকন) প্রভৃতি উপস্থিত থাকে।
সাইটোপ্লাজমের গঠন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।
সাইটোপ্লাজম প্রধানত দুটি উপাদান দ্বারা গঠিত:
- সাইটোপ্লাজমীয় ধাত্র বা সাইটোসল (Cytosol)
- সাইটোপ্লাজমীয় বস্তু বা ট্রোফোপ্লাজম (Trophoplasm)
1. সাইটোপ্লাজমীয় ধাত্র (Cytoplasmic matrix/Cytosol):
- সাইটোপ্লাজমীয় অঙ্গাণু ছাড়া সমসত্ত্ব, অর্ধস্বচ্ছ, কোলয়েড পদার্থকে সাইটোপ্লাজমীয় ধাত্র বা সাইটোসল বা হায়ালোপ্লাজম বলে।
- কোশের মধ্যে এটি দুভাবে বিন্যস্ত থাকে:
- (i) এক্টোপ্লাজম (কোশপর্দা সংলগ্ন অদানাদার ধাত্র)
- (ii) এন্ডোপ্লাজম (কোশের কেন্দ্র বরাবর বিন্যস্ত দানাদার ধাত্র)
2. সাইটোপ্লাজমীয় বস্তু (Cytoplasmic body):
সাইটোপ্লাজমীয় ধাত্রে উপস্থিত সমস্ত সজীব কোশীয় অঙ্গাণু ও কোলয়েড পদার্থকে সাইটোপ্লাজমীয় বস্তু বা ট্রোফোপ্লাজম বলে।
সাইটোপ্লাজমের উপাদানসমূহ
- সাইটোপ্লাজমীয় ধাত্র
- সাইটোপ্লাজমীয় অঙ্গাণু (পর্দাবৃত ও পর্দাবিহীন)
- কোশগহ্বর বা ভ্যাকুওল
- সাইটোপ্লাজমের অজীবীয় বস্তু বা ইনক্লুশনস (সঞ্চিত বস্তু, বর্জিত বস্তু, ক্ষরিত বস্তু)
সাইটোপ্লাজমের কাজগুলি লেখো
- আন্তঃকোশীয় বণ্টন: কোশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বিপাকজাত পদার্থ, উৎসেচক, পুষ্টিপদার্থ প্রভৃতি বণ্টনে সাহায্য করে।
- পদার্থের আদান-প্রদান: বিভিন্ন কোশীয় অঙ্গাণুর মধ্যে প্রয়োজনীয় উপাদানের আদান-প্রদানে সাহায্য করে।
- বিক্রিয়ার সংগঠন স্থান: গ্লাইকোলাইসিস, অবাত শ্বসন প্রভৃতি প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়।
- জৈব সংশ্লেষ: প্রোটিন, নিউক্লিওটাইড, ফ্যাটি অ্যাসিড প্রভৃতি জৈব অণু সংশ্লেষিত হয়।
- কোশ বিভাজন: নিউক্লিও-সাইটোপ্লাজমিক আন্তঃক্রিয়া ও আয়তনের অনুপাত নিয়ন্ত্রিত হয়।
- সাইটোপ্লাজমীয় গতি: সাইক্লোসিস দ্বারা কোশীয় অঙ্গাণুর সঞ্চালন ও অ্যামিবার ক্ষণপদ সৃষ্টি সম্ভব হয়।
নিউক্লিয়াস (Nucleus)
নিউক্লিয়াস কাকে বলে?
ইউক্যারিওটিক কোশের প্রোটোপ্লাজমের সবচেয়ে ঘন, প্রায় গোলাকার, লিপিড ও প্রোটিন দিয়ে তৈরি দুটি একক পর্দা দিয়ে ঢাকা যে অংশ বংশগত পদার্থ বা DNA বহন করে এবং কোশের যাবতীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে নিউক্লিয়াস বলে।
- বিজ্ঞানী রবার্ট ব্রাউন (Robert Brown, 1831) সর্বপ্রথম নিউক্লিয়াস আবিষ্কার ও নামকরণ করেন।
নিউক্লিয়াসের রাসায়নিক উপাদান
- 9-12% DNA
- 15% হিস্টোন (বেসিক) প্রোটিন
- 5% RNA
- প্রায় 65% আম্লিক ও প্রশমিত প্রোটিন এবং খনিজ আয়ন (Ca²⁺, K⁺, Na⁺)
নিউক্লিয়াসের গঠন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো
আদর্শ নিউক্লিয়াস চারটি অংশ নিয়ে গঠিত:
- নিউক্লিয় পর্দা (Nuclear membrane)
- নিউক্লিওপ্লাজম (Nucleoplasm)
- নিউক্লিয় জালিকা (Nuclear reticulum/Chromatin network)
- নিউক্লিওলাস (Nucleolus)
1. নিউক্লিয় পর্দা (Nuclear Membrane):
- নিউক্লিয়াসকে সাইটোপ্লাজম থেকে পৃথক রাখে।
- দুটি একক পর্দার অন্তর্বর্তী স্থানকে পরিনিউক্লিয়ার সিস্টারনি বলে।
- পর্দার স্থানে স্থানে সূক্ষ্ম ছিদ্র (নিউক্লিয়ার পোর) থাকে, যার মাধ্যমে নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজমের সংযোগ বজায় থাকে।
- কাজ: নিউক্লিয়াসের আকৃতি প্রদান, নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজমের সংযোগ রক্ষা, পৃথক রাখা।
2. নিউক্লিওপ্লাজম (Nucleoplasm):
- নিউক্লিয় পর্দা বেষ্টিত নিউক্লিয়াসের মধ্যে স্বচ্ছ, ঈষৎ আম্লিক, অর্ধতরল, সূক্ষ্ম দানাযুক্ত ধাত্রবস্তু।
- এতে নিউক্লিওপ্রোটিন, উৎসেচক, জৈব ও অজৈব পদার্থ (Na, Ca, P, Mg, K) থাকে।
- কাজ: নিউক্লিয়াসের ধাত্ররূপে কাজ করে, অন্যান্য অংশ ধারণ করে।
3. নিউক্লিয় জালিকা (Nuclear reticulum/Chromatin network):
- নিউক্লিওপ্লাজমে ভাসমান নিউক্লিয় প্রোটিন দ্বারা নির্মিত সূত্রাকার জালক।
- কোশ বিভাজনের সময় এই জালিকা থেকে ক্রোমোজোম সৃষ্টি হয়।
- ক্রোমোজোমে জিন (Gene) থাকে, যা বংশগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে।
- ক্রোমাটিন দুই প্রকার— (i) হেটারোক্রোমাটিন (ii) ইউক্রোমাটিন।
4. নিউক্লিওলাস (Nucleolus):
- নিউক্লিয়াসের সবচেয়ে ঘন, উজ্জ্বলভাবে রঞ্জিত, গোলাকার বা উপবৃত্তাকার গঠন।
- RNA ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত।
- সাধারণত একটি নিউক্লিয়াসে একটিই নিউক্লিওলাস থাকে।
- নিউক্লিওলাসে চারটি অঞ্চল: (i) গ্রানিউলার (ii) ফাইব্রিলার (iii) অ্যামরফাস (iv) অন্তঃ ও বহিঃ নিউক্লিয়ার ক্রোমাটিন।
- কাজ: নিউক্লিওপ্রোটিনের সঞ্চয়, RNA উৎপাদন ও প্রোটিন সংশ্লেষে অংশগ্রহণ।
নিউক্লিয়াসের কাজগুলি আলোচনা করো
- বিপাকীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ: উৎসেচক সংশ্লেষের মাধ্যমে কোশের যাবতীয় বিপাকীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এজন্য নিউক্লিয়াসকে 'কোশের মগজ' (Brain of the Cell) বলে।
- বংশগত তথ্যের ভান্ডার: নিউক্লিয়াসে জীবদেহের বংশগত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষিত থাকে।
- RNA সংশ্লেষ: নিউক্লিওলাসে RNA সংশ্লেষ ঘটে।
- কোশবিভাজন: কোশবিভাজনে নিউক্লিয়াস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- বংশগত বৈশিষ্ট্যের সঞ্চারণ: নিউক্লিয়াসের DNA-এর মাধ্যমে জীবের বংশগত বৈশিষ্ট্য এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়।
- প্রকরণ বা ভেদ সৃষ্টি: নিউক্লিয়াসস্থিত ক্রোমোজোমের গঠন ও সংখ্যার পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকরণ সৃষ্টি হয়।
নিউক্লিয়াসের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে কোশের শ্রেণিবিভাগ
- ইনিউক্লিয়েট (Enucleate): নিউক্লিয়াসবিহীন কোশ (যেমন— স্তন্যপায়ীর লোহিত রক্তকণিকা, উদ্ভিদের ফ্লোয়েমের সিভনল কোশ)
- মনোনিউক্লিয়েট (Mononucleate): একক নিউক্লিয়াসযুক্ত কোশ
- বাইনিউক্লিয়েট (Binucleate): দুটি নিউক্লিয়াসযুক্ত কোশ (যেমন— প্যারামেসিয়াম)
- মাল্টিনিউক্লিয়েট (Multinucleate): বহু নিউক্লিয়াসযুক্ত কোশ (উদ্ভিদকোশ সিনোসাইট, প্রাণীকোশ সিনসাইটিয়াল)
সেন্ট্রাল ডগমা (Central Dogma)
DNA → (রেপ্লিকেশন) → DNA
DNA → (ট্রান্সক্রিপশন) → RNA
RNA → (ট্রান্সলেশন) → প্রোটিন
RNA → (রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন) → DNA
ধন্যবাদ