CLASS NO: 02
উদ্ভিদ কলা (Plant Tissue) এর বিস্তারিত আলোচনা
গত ক্লাসে আমরা কলার প্রাথমিক ধারণা পেয়েছি। এই পাঠ্যে আমরা উদ্ভিদ কলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, স্থায়ী কলা, নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
স্থায়ী কলা (Permanent Tissue)
ভাজক কলা থেকে উৎপন্ন, বিভাজনে অক্ষম এবং নির্দিষ্ট আকৃতিযুক্ত পরিণত কোষ দ্বারা গঠিত কলাকে স্থায়ী কলা বলে।
স্থায়ী কলা প্রধানত তিন প্রকার:
- (i) সরল স্থায়ী কলা (Simple Permanent Tissue)
- (ii) জটিল স্থায়ী কলা (Complex Permanent Tissue)
- (iii) বিশেষ বা ক্ষরিত কলা (Special or Secretory Tissue)
i) সরল স্থায়ী কলা (Simple Permanent Tissue): যে স্থায়ী কলার কোষগুলি গঠন ও কাজের দিক থেকে একই প্রকৃতির হয়, তাকে সরল স্থায়ী কলা বলে। এটি তিন প্রকার: (a) প্যারেনকাইমা, (b) কোলেনকাইমা, এবং (c) স্ক্লেরেনকাইমা।
ii) জটিল স্থায়ী কলা (Complex Permanent Tissue): যে স্থায়ী কলা একাধিক প্রকার কোষ দ্বারা গঠিত এবং কোষগুলি সম্মিলিতভাবে একটি নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে, তাকে জটিল স্থায়ী কলা বলে। এটি দু-প্রকার: (a) জাইলেম এবং (b) ফ্লোয়েম।
সরল স্থায়ী কলার বিস্তারিত আলোচনা
১. প্যারেনকাইমা (Parenchyma)
সংজ্ঞা: যে সরল স্থায়ী কলার সজীব কোষগুলি সেলুলোজ নির্মিত পাতলা কোষপ্রাচীরযুক্ত, কোষান্তর রন্ধ্রযুক্ত এবং গোলাকার, ডিম্বাকার বা বহুভুজাকার আকৃতির হয়, তাকে প্যারেনকাইমা বলে।
বৈশিষ্ট্য:
- আকৃতি: কোষগুলি সাধারণত গোলাকার, ডিম্বাকার বা বহুভুজাকার।
- কোষপ্রাচীর: কোষপ্রাচীর পাতলা এবং সেলুলোজ দ্বারা নির্মিত।
- কোষীয় উপাদান: কোষে সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াস, সাইটোপ্লাজম এবং একটি বৃহৎ কেন্দ্রীয় ভ্যাকুওল বা কোষগহ্বর থাকে।
- আন্তঃকোষীয় স্থান: কোষগুলির মাঝে কোষান্তর রন্ধ্র বা ফাঁকা স্থান উপস্থিত থাকে।
প্রকারভেদ ও কাজ:
- ক্লোরেনকাইমা: ক্লোরোফিলযুক্ত প্যারেনকাইমা, যা সালোকসংশ্লেষে খাদ্য তৈরি করে।
- এরেনকাইমা: বড় বায়ুকুঠুরিযুক্ত প্যারেনকাইমা, যা জলজ উদ্ভিদকে জলে ভেসে থাকতে সাহায্য করে।
- প্রোসেনকাইমা: দীর্ঘাকৃতি প্যারেনকাইমা, যা উদ্ভিদকে যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান করে।
- ইডিওব্লাস্ট: এই প্যারেনকাইমা কোষে ট্যানিন, রেজিন, গঁদ প্রভৃতি বর্জ্য পদার্থ সঞ্চিত থাকে।
- অন্যান্য কাজ: খাদ্য ও জল সঞ্চয় করা, পরিবহণে সাহায্য করা, ক্ষত নিরাময় এবং অঙ্গজ জননে অংশ নেওয়া এর অন্যতম কাজ।
২. কোলেনকাইমা (Collenchyma)
সংজ্ঞা: যে সরল স্থায়ী কলার সজীব কোষগুলির কোষপ্রাচীর অসমভাবে স্থূল, কোষান্তর রন্ধ্র অনুপস্থিত বা খুব কম এবং কোষগুলি সাধারণত সেলুলোজ, পেকটিন বা লিগনিন জমে স্থূল হয়, তাদের কোলেনকাইমা কলা বলে।
বৈশিষ্ট্য:
- আকার: সজীব কোষগুলি গোলাকার, বেলনাকার বা বহুভুজাকার হয়।
- কোষপ্রাচীর: কোষপ্রাচীর অসমভাবে স্থূল হয়। বিশেষ করে কোষের কোণগুলিতে অতিরিক্ত সেলুলোজ, পেকটিন জমা হওয়ায় বেশি স্থূল দেখায়।
- আন্তঃকোষীয় স্থান: কোষান্তর রন্ধ্র সাধারণত থাকে না।
কাজ:
- যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান: উদ্ভিদ অঙ্গকে, বিশেষ করে বর্ধনশীল কাণ্ড ও পাতাকে যান্ত্রিক দৃঢ়তা ও স্থিতিস্থাপকতা (flexibility) প্রদান করে।
- সালোকসংশ্লেষ: ক্লোরোপ্লাস্টযুক্ত কোলেনকাইমা খাদ্য তৈরি করতে পারে।
৩. স্ক্লেরেনকাইমা (Sclerenchyma)
সংজ্ঞা: যে সরল স্থায়ী কলা মৃত, লিগনিনযুক্ত অত্যন্ত স্থূল কোষপ্রাচীরবিশিষ্ট এবং প্রোটোপ্লাজমবিহীন কোষ দ্বারা গঠিত, তাকে স্ক্লেরেনকাইমা বলে।
বৈশিষ্ট্য:
- প্রকৃতি: কোষগুলি পরিণত অবস্থায় প্রোটোপ্লাজমবিহীন, অর্থাৎ মৃত।
- কোষপ্রাচীর: লিগনিন জমা হওয়ার কারণে কোষপ্রাচীর অত্যন্ত স্থূল, দৃঢ় এবং কূপযুক্ত হয়।
- আন্তঃকোষীয় স্থান: কোষগুলি ঘনসন্নিবিষ্ট হওয়ায় কোষান্তর রন্ধ্র থাকে না।
স্ক্লেরেনকাইমার প্রকারভেদ:
স্ক্লেরেনকাইমা প্রধানত দুই প্রকারের হয়:
- স্ক্লেরেনকাইমা তন্তু (Fibre): এগুলি দীর্ঘ, সরু এবং দুই প্রান্ত ছুঁচোলো কোষ। পাট, শণ হলো বাস্ট ফাইবারের উদাহরণ।
- স্ক্লেরাইড বা প্রস্তর কোষ (Sclereid): এগুলি খর্বাকার, অনিয়তাকার কোষ। কোষপ্রাচীর পাথরের মতো শক্ত হয় বলে এদের স্টোন সেল বলে। পেয়ারা, নাসপাতির শাঁসে এদের পাওয়া যায়।
কাজ:
- যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান: উদ্ভিদ অঙ্গকে যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান করা এর প্রধান কাজ।
- সুরক্ষা: ফল ও বীজের ত্বক গঠন করে ভেতরের অংশকে রক্ষা করে।
- অর্থনৈতিক গুরুত্ব: পাট, শণ, নারকেলের ছোবড়া প্রভৃতি তন্তু দড়ি, বস্তা, কাপড় তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
প্যারেনকাইমা, কোলেনকাইমা ও স্ক্লেরেনকাইমার মধ্যে পার্থক্য
| বিষয় |
প্যারেনকাইমা |
কোলেনকাইমা |
স্ক্লেরেনকাইমা |
| প্রকৃতি |
কোষগুলি সজীব। |
কোষগুলি সজীব। |
পরিণত কোষগুলি মৃত। |
| কোষপ্রাচীর |
পাতলা ও সেলুলোজ নির্মিত। |
অসমভাবে স্থূল (কোণগুলিতে বেশি)। |
সমভাবে এবং অত্যন্ত স্থূল (লিগনিনযুক্ত)। |
| কোষান্তর রন্ধ্র |
উপস্থিত থাকে। |
সাধারণত অনুপস্থিত। |
অনুপস্থিত। |
| প্রধান কাজ |
খাদ্য প্রস্তুত, সঞ্চয় ও পরিবহন। |
যান্ত্রিক দৃঢ়তা ও স্থিতিস্থাপকতা প্রদান। |
যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান। |
ধন্যবাদ