CLASS NO: 01
১. ভূমিকা (Introduction)
জীবদেহের বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ, শক্তি উৎপাদন এবং রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রত্যেক জীবের খাদ্যের প্রয়োজন হয়। যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জীব খাদ্য গ্রহণ করে এবং সেই খাদ্যকে পরিপাক ও শোষণের মাধ্যমে দেহের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজে ব্যবহার করে, তাকে পুষ্টি (Nutrition) বলে।
খাদ্য হলো সেইসব জৈব ও অজৈব উপাদান যা জীবের পুষ্টি সাধন করে।
২. খাদ্যের প্রধান উপাদান (Major Components of Food)
কাজের প্রকৃতি অনুসারে খাদ্যের উপাদানগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
-
দেহ-পরিপোষক খাদ্য (Macronutrients): যে সকল খাদ্য উপাদান দেহের গঠন, বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ এবং শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করে। এদের বেশি পরিমাণে প্রয়োজন হয়।
- কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা (Carbohydrate)
- প্রোটিন বা আমিষ (Protein)
- ফ্যাট বা স্নেহ পদার্থ (Fat/Lipid)
-
দেহ-সংরক্ষক খাদ্য (Micronutrients): যে সকল খাদ্য উপাদান শক্তি উৎপাদন না করলেও দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এদের অল্প পরিমাণে প্রয়োজন হয়।
- ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ (Vitamin)
- খনিজ লবণ (Minerals)
এছাড়াও জল (Water) এবং খাদ্যতন্তু বা রাফেজ (Dietary Fiber/Roughage) দেহের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় দুটি উপাদান।
৩. দেহ-পরিপোষক খাদ্য (Macronutrients)
ক) কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা (Carbohydrate)
- সংজ্ঞা: কার্বন (C), হাইড্রোজেন (H) এবং অক্সিজেন (O) দ্বারা গঠিত যে জৈব যৌগ দেহে শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে, তাকে কার্বোহাইড্রেট বলে। এতে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের অনুপাত 2:1 থাকে (জলের মতো)।
- প্রকারভেদ:
- মোনোস্যাকারাইড (Monosaccharide) বা সরল শর্করা: এরা সরাসরি রক্তে শোষিত হতে পারে। যেমন- গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ (ফলের শর্করা), গ্যালাকটোজ।
- ডাইস্যাকারাইড (Disaccharide) বা দ্বি-শর্করা: দুটি মনোস্যাকারাইড অণু দ্বারা গঠিত হয়। যেমন- সুক্রোজ (চিনি), ল্যাকটোজ (দুধের শর্করা), মল্টোজ।
- পলিস্যাকারাইড (Polysaccharide) বা বহু-শর্করা: অসংখ্য মনোস্যাকারাইড অণু নিয়ে গঠিত। যেমন- শ্বেতসার বা স্টার্চ (Starch), গ্লাইকোজেন (প্রাণীদেহে সঞ্চিত শর্করা), সেলুলোজ।
- কাজ: দেহে শক্তি উৎপাদন করা এর প্রধান কাজ। কোষ প্রাচীর (উদ্ভিদের ক্ষেত্রে সেলুলোজ) গঠনে সাহায্য করে।
- উৎস: ভাত, রুটি, আলু, চিনি, গুড়, ফল, মধু ইত্যাদি।
- দৈনিক চাহিদা: একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক প্রায় 300-400 গ্রাম কার্বোহাইড্রেট প্রয়োজন।
- তাপন মূল্য (Calorific Value): 1 গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থেকে প্রায় 4.1 kcal শক্তি উৎপন্ন হয়।
খ) প্রোটিন বা আমিষ (Protein)
- সংজ্ঞা: কার্বন (C), হাইড্রোজেন (H), অক্সিজেন (O) এবং নাইট্রোজেন (N) দ্বারা গঠিত অ্যামাইনো অ্যাসিডের পলিমারকে প্রোটিন বলে।
- গঠনগত একক: অ্যামাইনো অ্যাসিড (Amino Acid)।
- কাজ: দেহকোষ গঠন, বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ করা এর প্রধান কাজ। উৎসেচক (Enzyme), হরমোন ও অ্যান্টিবডি তৈরি করে।
- উৎস: মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল, সয়াবিন, বাদাম, পনির ইত্যাদি।
- অভাবজনিত রোগ: শিশুদের ক্ষেত্রে কোয়াশিওরকর (শুধু প্রোটিনের অভাবে) এবং ম্যারাসমাস (প্রোটিন ও ক্যালোরি উভয়ের অভাবে) রোগ হয়।
- তাপন মূল্য: 1 গ্রাম প্রোটিন থেকে প্রায় 4.2 kcal শক্তি উৎপন্ন হয়।
গ) ফ্যাট বা স্নেহ পদার্থ (Fat/Lipid)
- সংজ্ঞা: ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারলের এস্টার হলো ফ্যাট। এটি কার্বন (C), হাইড্রোজেন (H) ও অক্সিজেন (O) দিয়ে গঠিত।
- কাজ: দেহে শক্তির উৎসরূপে সঞ্চিত থাকে। দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং ফ্যাটে দ্রবণীয় ভিটামিন (A, D, E, K) শোষণে সহায়তা করে।
- উৎস: তেল, ঘি, মাখন, চর্বি, বাদাম, ডিমের কুসুম ইত্যাদি।
- তাপন মূল্য: 1 গ্রাম ফ্যাট থেকে প্রায় 9.3 kcal শক্তি উৎপন্ন হয়, যা সব খাদ্য উপাদানের মধ্যে সর্বোচ্চ।
৪. দেহ-সংরক্ষক খাদ্য (Micronutrients)
ক) ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ (Vitamin)
ভিটামিন হলো এক প্রকার জৈব যৌগ যা খাদ্যে অতি অল্প পরিমাণে উপস্থিত থেকে দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, পুষ্টি এবং রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। বিজ্ঞানী ক্যাসিমির ফাঙ্ক (Casimir Funk) 1912 সালে প্রথম 'ভিটামিন' শব্দটি প্রবর্তন করেন।
| ভিটামিনের নাম |
রাসায়নিক নাম |
অভাবজনিত রোগ |
উৎস |
| ভিটামিন A |
রেটিনল |
রাতকানা, জেরফথ্যালমিয়া |
গাজর, পাকা আম, দুধ, ডিম |
| ভিটামিন D |
ক্যালসিফেরল |
রিকেট (শিশু), অস্টিওম্যালেশিয়া (প্রাপ্তবয়স্ক) |
সূর্যরশ্মি, দুধ, মাছের তেল |
| ভিটামিন E |
টোকোফেরল |
বন্ধ্যাত্ব, ত্বকের সমস্যা |
উদ্ভিজ্জ তেল, বাদام, অঙ্কুরিত ছোলা |
| ভিটামিন K |
ফাইলোকুইনোন |
রক্ত তঞ্চনে বাধা |
পালং শাক, বাঁধাকপি, সয়াবিন তেল |
| ভিটামিন B1 |
থায়ামিন |
বেরিবেরি |
ঢেঁকিছাঁটা চাল, আটা, বাদাম |
| ভিটামিন B12 |
সায়ানোকোবালামিন |
পারনিসিয়াস অ্যানিমিয়া |
মাছ, মাংস, ডিম (উদ্ভিজ্জ খাদ্যে অনুপস্থিত) |
| ভিটামিন C |
অ্যাসকরবিক অ্যাসিড |
স্কার্ভি (মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া) |
আমলকী, পেয়ারা, লেবু, কাঁচা লঙ্কা |
খ) খনিজ লবণ (Minerals)
| খনিজের নাম |
প্রধান কাজ |
অভাবজনিত রোগ/লক্ষণ |
উৎস |
| ক্যালসিয়াম (Ca) |
হাড় ও দাঁত গঠন, রক্ত তঞ্চন |
রিকেট, অস্টিওপোরোসিস (হাড় ভঙ্গুর হওয়া) |
দুধ, ছোট মাছ, সবুজ শাকসবজি |
| লোহা (Fe) |
হিমোগ্লোবিন গঠন |
অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা |
পালং শাক, কচু শাক, মাংস, গুড় |
| আয়োডিন (I) |
থাইরক্সিন হরমোন গঠন |
গলগণ্ড বা গয়টার |
আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক মাছ |
| সোডিয়াম (Na) |
দেহে জলের ভারসাম্য রক্ষা |
পেশীর খিঁচুনি, নিম্ন রক্তচাপ |
খাদ্য লবণ |
৫. অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদান
- জল (Water): মানবদেহের প্রায় ৬০-৭০% হলো জল। এটি দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, রক্ত সঞ্চালন এবং বর্জ্য নিষ্কাশনে সাহায্য করে।
- খাদ্যতন্তু বা রাফেজ (Dietary Fiber): এটি অপাচ্য কার্বোহাইড্রেট যা মল তৈরিতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।
৬. সুষম খাদ্য (Balanced Diet)
যে খাদ্যে দেহের প্রয়োজন অনুযায়ী কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ লবণ এবং জল সঠিক অনুপাতে উপস্থিত থাকে, তাকে সুষম খাদ্য বলে। একজন ব্যক্তির খাদ্যের চাহিদা তার বয়স, লিঙ্গ ও শারীরিক পরিশ্রমের উপর নির্ভর করে।
৭. মৌল বিপাক হার (Basal Metabolic Rate - BMR)
পূর্ণ বিশ্রামরত অবস্থায় দেহের অপরিহার্য শারীরবৃত্তীয় কাজ চালানোর জন্য ন্যূনতম যে শক্তির প্রয়োজন হয়, তাকে মৌল বিপাক হার বা BMR বলে। BMR এর উপর ভিত্তি করে একজন ব্যক্তির দৈনিক ক্যালোরির চাহিদা নির্ণয় করা হয়।