CLASS NO: 03
মানব কঙ্কালতন্ত্র (Human Skeletal System)
মানব কঙ্কালতন্ত্র হলো অস্থি, তরুণাস্থি, লিগামেন্ট এবং টেনডন দ্বারা গঠিত একটি জটিল কাঠামো যা দেহকে আকার ও সুরক্ষা প্রদান করে এবং চলাচলে সহায়তা করে। এটি আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ কাঠামো বা ফ্রেমওয়ার্ক।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দেহে মোট ২০৬টি অস্থি বা হাড় থাকে। তবে মজার বিষয় হলো, একটি নবজাতক শিশুর দেহে প্রায় ৩০০টি অস্থি থাকে। বয়সের সাথে সাথে কিছু ছোট ছোট অস্থি একসাথে জুড়ে গিয়ে একটি বড় অস্থিতে পরিণত হয়, ফলে অস্থির সংখ্যা কমে আসে।
১. কঙ্কালতন্ত্রের উপাদান (Components of the Skeletal System)
কঙ্কালতন্ত্র কেবল হাড় নিয়ে গঠিত নয়। এর প্রধান উপাদানগুলো হলো:
- অস্থি (Bone): এটি কঙ্কালতন্ত্রের প্রধান ও সবচেয়ে কঠিন উপাদান। এটি ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মতো খনিজ লবণ এবং কোলাজেন তন্তু দ্বারা গঠিত একটি জীবন্ত কলা।
- তরুণাস্থি (Cartilage): এটি অস্থির চেয়ে নরম ও অনেক বেশি স্থিতিস্থাপক। এটি দুটি অস্থির সংযোগস্থলে (অস্থিসন্ধিতে) ঘর্ষণ কমাতে সাহায্য করে।
- লিগামেন্ট (Ligament): এটি এক প্রকার তন্তুময় যোজক কলা যা একটি হাড়কে অন্য হাড়ের সাথে যুক্ত করে এবং অস্থিসন্ধিকে দৃঢ়তা প্রদান করে।
- টেনডন (Tendon): এটিও এক প্রকার দৃঢ়, তন্তুময় যোজক কলা যা পেশিকে হাড়ের সাথে যুক্ত করে।
২. কঙ্কালতন্ত্রের কাজ (Functions of the Skeletal System)
কঙ্কালতন্ত্রের বহুবিধ গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে:
- কাঠামো প্রদান (Support): এটি শরীরকে একটি নির্দিষ্ট আকার ও কাঠামো দেয়।
- সুরক্ষা (Protection): কঙ্কালতন্ত্র শরীরের সংবেদনশীল অঙ্গগুলোকে (যেমন: মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস) বাহ্যিক আঘাত থেকে রক্ষা করে।
- চলাচল ও নড়াচড়া (Movement): পেশিগুলো কঙ্কালের হাড়গুলোকে লিভার হিসেবে ব্যবহার করে শরীরের চলাচল সম্ভব করে তোলে।
- রক্তকণিকা উৎপাদন (Blood Cell Production): হাড়ের ভেতরের অস্থিমজ্জা (Bone Marrow) থেকে লোহিত ও শ্বেত রক্তকণিকা তৈরি হয়।
- খনিজ লবণ সঞ্চয় (Mineral Storage): হাড় ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে।
- চর্বি সঞ্চয় (Fat Storage): কিছু হাড়ের হলুদ অস্থিমজ্জা চর্বি সঞ্চয় করে শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।
৩. কঙ্কালতন্ত্রের প্রকারভেদ (Classification of the Skeletal System)
গঠন ও অবস্থান অনুযায়ী মানব কঙ্কালতন্ত্রকে প্রধান দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:
৪. অস্থির গঠন ও প্রকারভেদ (Structure and Types of Bones)
- অস্থির গঠন: প্রতিটি অস্থি বাইরে পেরিঅস্টিয়াম নামক আবরণ দ্বারা আবৃত থাকে। এর নিচে থাকে কঠিন কমপ্যাক্ট অস্থি এবং ভেতরে থাকে স্পঞ্জের মতো স্পঞ্জি অস্থি ও অস্থিমজ্জা।
- আকৃতি অনুযায়ী প্রকারভেদ: লম্বা অস্থি (ফিমার), খাটো অস্থি (কার্পাল), চ্যাপ্টা অস্থি (স্টার্নাম) এবং অনিয়ত অস্থি (কশেরুকা)।
৫. অস্থিসন্ধি (Joints)
যেখানে দুই বা ততোধিক অস্থি মিলিত হয়, তাকে অস্থিসন্ধি বলে। নড়াচড়ার ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে অস্থিসন্ধি তিন প্রকার:
- নিশ্চল বা অনড় সন্ধি: নড়াচড়া করতে পারে না। যেমন - করোটির সন্ধি।
- ঈষৎ সচল সন্ধি: সামান্য নড়াচড়া করতে পারে। যেমন - কশেরুকার মধ্যবর্তী সন্ধি।
- পূর্ণ সচল বা সাইনোভিয়াল সন্ধি: সহজে নড়াচড়া করতে পারে। যেমন - হাঁটু, কনুই, কাঁধের সন্ধি।
৬. কঙ্কালতন্ত্রের সাধারণ রোগ ও সমস্যা
- অস্টিওপোরোসিস (Osteoporosis): ক্যালসিয়ামের অভাবে হাড় ভঙ্গুর ও দুর্বল হয়ে যাওয়ার রোগ।
- আর্থ্রাইটিস বা বাত (Arthritis): অস্থিসন্ধিতে প্রদাহ বা ব্যথা হওয়া।
- রিকেটস (Rickets): ভিটামিন ডি-এর অভাবে শিশুদের হাড় নরম ও বেঁকে যাওয়া।
- অস্থিভঙ্গ (Fracture): কোনো আঘাতের কারণে হাড় ভেঙে যাওয়া।