CLASS NO: 01
ভূমিকা: চলন ও গমনের পার্থক্য
জীবদেহের একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো উত্তেজনায় সাড়া দেওয়া এবং স্থান পরিবর্তন করা। এই প্রসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো চলন ও গমন। চলন (Movement) হল এক জায়গায় স্থির থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালন করা, আর গমন (Locomotion) হল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালনের মাধ্যমে স্থান পরিবর্তন করা। মূল পার্থক্য: সকল গমনই চলন, কিন্তু সকল চলন গমন নয়।
১. এককোষী প্রাণীর গমন (Locomotion in Unicellular Organisms)
ক) অ্যামিবার গমন (Amoeboid Locomotion)
- গমনাঙ্গ: ক্ষণপদ বা সিউডোপোডিয়া (Pseudopodia)।
- পদ্ধতি: অ্যামিবার কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই। গমনের সময় এর কোষপর্দা থেকে আঙুলের মতো অস্থায়ী প্রবর্ধক বা ক্ষণপদ তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়াকে অ্যামিবয়েড গমন বলে।
খ) প্যারামেসিয়ামের গমন (Ciliary Locomotion)
- গমনাঙ্গ: সিলিয়া (Cilia)। এগুলি কোষের চারপাশে থাকা ছোট ছোট চুলের মতো অঙ্গাণু।
- প পদ্ধতি: সিলিয়াগুলির ছন্দোবদ্ধ আন্দোলনের ফলে প্যারামেসিয়াম জলে সাঁতার কেটে এগিয়ে যায়। এই গমনকে সিলিয়ারি গমন বলে।
গ) ইউগ্লিনার গমন (Flagellar Locomotion)
- গমনাঙ্গ: ফ্ল্যাজেলা (Flagellum)। এটি কোষের অগ্রভাগে অবস্থিত একটি লম্বা, চাবুকের মতো অঙ্গাণু।
- পদ্ধতি: ইউগ্লিনা তার ফ্ল্যাজেলাকে চাবুকের মতো সঞ্চালিত করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। এই গমনকে ফ্ল্যাজেলারি গমন বলে।
২. মাছের গমন (Locomotion in Fish)
মাছের গমন পদ্ধতি হলো সন্তরণ (Swimming)।
- প্রধান গমনাঙ্গ: পাখনা (Fins) এবং মায়োটম পেশি (Myotome Muscle)।
- পাখনার কাজ:
- পুচ্ছ পাখনা (লেজ): প্রধান চালিকাশক্তি এবং দিক পরিবর্তনে সাহায্য করে।
- পৃষ্ঠ ও পায়ু পাখনা: দেহের ভারসাম্য রক্ষা করে।
- বক্ষ ও শ্রোণি পাখনা: সামনে এগোনো, থামা ও দিক পরিবর্তনে সাহায্য করে।
- সহায়ক অঙ্গ: পটকা (Swim Bladder) মাছকে জলে ভাসতে সাহায্য করে।
৩. পাখির গমন (Locomotion in Birds)
পাখির গমন পদ্ধতি হলো উড্ডয়ন (Flight)।
- প্রধান গমনাঙ্গ: একজোড়া ডানা (Wings)।
- উড্ডয়ন পেশি: পেক্টোরালিস মেজর (ডানা নামাতে) এবং পেক্টোরালিস মাইনর (ডানা তুলতে)।
- পালক (Feathers): রেমিজেস (ডানার পালক, ২৩টি) ওড়ার জন্য এবং রেকট্রিসেস (লেজের পালক, ১২টি) দিক পরিবর্তনের জন্য ব্যবহৃত হয়।
- অভিযোজন: হালকা ও ফাঁপা অস্থি, মাকু আকৃতির দেহ এবং বায়ুথলি (Air Sacs) ওড়ার জন্য সহায়ক।
৪. মানুষের গমন (Human Locomotion)
মানুষের গমন পদ্ধতি হলো দ্বিপদ গমন (Bipedal Locomotion)। এটি কঙ্কালতন্ত্র ও পেশিতন্ত্রের সমন্বিত ক্রিয়ার ফল।
ক) মানব কঙ্কালতন্ত্র (Human Skeletal System)
প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দেহে ২০৬টি অস্থি থাকে। দীর্ঘতম ও শক্তিশালী অস্থি হলো ফিমার (উরুর অস্থি) এবং ক্ষুদ্রতম অস্থি হলো স্টেপিস (কানের অস্থি)।
- অস্থিসন্ধির প্রকারভেদ:
- বল ও সকেট সন্ধি: কাঁধের সন্ধি ও ঊরুসন্ধি।
- কব্জা বা হিঞ্জ সন্ধি: কনুইয়ের সন্ধি ও হাঁটুর সন্ধি।
- পিভট সন্ধি: ঘাড়ের কশেরুকার সন্ধি।
খ) মানব পেশিতন্ত্র (Human Muscular System)
- পেশির কার্যপদ্ধতি: পেশিগুলি জোড়ায় কাজ করে (অ্যান্টাগোনিস্টিক পেশি)। যেমন কনুই ভাঁজ করার সময় বাইসেপস (ফ্লেক্সর) সংকুচিত হয় এবং ট্রাইসেপস (এক্সটেনসর) প্রসারিত হয়।
- বিভিন্ন পেশীর ক্রিয়া:
- ফ্লেক্সন: অঙ্গকে ভাঁজ করা।
- এক্সটেনশন: ভাঁজ হওয়া অঙ্গকে সোজা করা।
- অ্যাবডাকশন: অঙ্গকে দেহ থেকে দূরে সরানো।
- অ্যাডাকশন: অঙ্গকে দেহের কাছে আনা।
- ভারসাম্য রক্ষা: গমনের সময় দেহের ভারসাম্য রক্ষা করে মস্তিষ্কের লঘুমস্তিষ্ক (Cerebellum)।