অধ্যায়: উদ্ভিদ ও প্রাণীর রোগ এবং অনাক্রমতা

দিন/রাত

CLASS NO: 05

অসংক্রামক রোগ (Non-Communicable Diseases - NCDs)

সংজ্ঞা:

যে সমস্ত রোগ এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে সংক্রমিত হয় না, অর্থাৎ ছোঁয়াচে নয়, তাদের অসংক্রামক রোগ বলে। এই রোগগুলো সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ধীরে ধীরে শরীরের ক্ষতি করে। জীবনযাত্রা (Lifestyle), জিনগত (Genetic) কারণ, পরিবেশ এবং বার্ধক্যজনিত কারণে এই রোগগুলো হয়ে থাকে।

অসংক্রামক রোগের প্রধান শ্রেণীবিভাগ ও বিস্তারিত তথ্য

১. অভাবজনিত রোগ (Deficiency Diseases)

খাদ্যতালিকায় কোনো নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের (যেমন: ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, প্রোটিন) দীর্ঘস্থায়ী অভাবে এই রোগগুলো হয়।

রোগের নাম কিসের অভাবে হয় প্রধান লক্ষণ ও তথ্য
কোয়াশিয়রকর (Kwashiorkor) প্রোটিনের অভাব শিশুদের পেট ফুলে যায়, বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ত্বক ও চুলের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
ম্যারাসমাস (Marasmus) প্রোটিন ও ক্যালোরি উভয়ের অভাব শিশু অত্যন্ত শীর্ণ ও দুর্বল হয়ে পড়ে, শরীরের সব চর্বি ক্ষয় হয়ে যায়।
রক্তাল্পতা (Anemia) আয়রন (লোহা), ভিটামিন B12 বা ফলিক অ্যাসিড শরীরে লোহিত রক্তকণিকা (RBC) বা হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যায়, ফলে দুর্বলতা, ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।
গলগন্ড (Goitre) আয়োডিন (Iodine) গলার থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে ওঠে। এর ফলে থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদন ব্যাহত হয়।
স্কার্ভি (Scurvy) ভিটামিন C মাড়ি থেকে রক্তপাত হয়, দাঁত দুর্বল হয়ে যায়, ক্ষতস্থান সহজে শুকায় না।
রিকেট (Rickets) ভিটামিন D শিশুদের হাড় নরম ও দুর্বল হয়ে বেঁকে যায়।
অস্টিওম্যালেসিয়া (Osteomalacia) ভিটামিন D প্রাপ্তবয়স্কদের হাড় নরম হয়ে যায়।
রাতকানা (Night Blindness) ভিটামিন A কম আলোতে দেখতে অসুবিধা হয়।
বেরিবেরি (Beri-Beri) ভিটামিন B1 (থায়ামিন) স্নায়ুতন্ত্র ও হৃৎপিণ্ডকে প্রভাবিত করে, দুর্বলতা ও শরীর ফুলে যায়।
পেলেগ্রা (Pellagra) ভিটামিন B3 (নিয়াসিন) ত্বক, পরিপাকতন্ত্র এবং স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে।

২. বংশগত বা জেনেটিক রোগ (Hereditary/Genetic Diseases)

এই রোগগুলো জিন বা ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারণে সৃষ্টি হয় এবং বংশপরম্পরায় বাহিত হয়।

রোগের নাম কারণ ও তথ্য
হিমোফিলিয়া (Haemophilia) X-ক্রোমোজোম বাহিত একটি রোগ। রক্ত তঞ্চনকারী ফ্যাক্টর (Factor VIII বা IX) তৈরি হয় না, ফলে কেটে গেলে রক্তপাত বন্ধ হতে চায় না। একে 'রাজকীয় রোগ' (Royal Disease) বলা হয়।
বর্ণান্ধতা (Colour Blindness) X-ক্রোমোজোম বাহিত রোগ। রোগী লাল ও সবুজ রঙের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না।
থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia) হিমোগ্লোবিনের গঠনগত ত্রুটির কারণে হয়। এর ফলে মারাত্মক রক্তাল্পতা দেখা দেয়।
ডাউন সিনড্রোম (Down Syndrome) ২১ নম্বর ক্রোমোজোমের ট্রাইসোমি (দুটির বদলে তিনটি কপি) থাকার কারণে হয়। মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হয়।
সিকেল সেল অ্যানিমিয়া (Sickle Cell Anemia) লোহিত রক্তকণিকার আকৃতি কাস্তের মতো হয়ে যায়, ফলে অক্সিজেন পরিবহণ ক্ষমতা কমে যায়।

৩. দূষণজনিত রোগ (Diseases caused by Pollution)

পরিবেশে উপস্থিত ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থের কারণে এই রোগগুলো হয়।

রোগের নাম দূষক পদার্থ (Pollutant) প্রধান প্রভাব
মিনামাটা (Minamata Disease) পারদ (Mercury) স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হয়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অবש হয়ে যায়।
ইটাই-ইটাই (Itai-Itai Disease) ক্যাডমিয়াম (Cadmium) হাড় ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি হয়, হাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা হয়।
ব্ল্যাক ফুট ডিজিজ (Black Foot Disease) আর্সেনিক (Arsenic) পায়ের পাতায় কালো ছোপ দেখা যায় এবং পরে গ্যাংগ্রিন হতে পারে।
ডিসলেক্সিয়া (Dyslexia - দূষণজনিত) সিসা (Lead) স্নায়ুতন্ত্র, বিশেষত শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা দেয়। (মনে রাখবেন, Dyslexia বলতে সাধারণত শিখন অক্ষমতা বোঝায়, কিন্তু সিসা দূষণজনিত স্নায়বিক সমস্যাকেও এই নামে ডাকা হয়)।
সিলিকোসিস ও অ্যাসবেসটোসিস সিলিকা ও অ্যাসবেসটস কণা ফুসফুসের রোগ, যা মূলত খনি ও কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে দেখা যায়। এগুলি পেশাগত রোগ (Occupational Disease)

৪. জীবনযাত্রা সম্পর্কিত রোগ (Lifestyle Diseases)

অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা, যেমন - ভুল খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, মানসিক চাপ, ধূমপান ও মদ্যপানের কারণে এই রোগগুলো হয়।

রোগের নাম কারণ ও তথ্য
ডায়াবেটিস মেলিটাস (মধুমেহ) ইনসুলিন হরমোনের অভাব বা অকার্যকারিতা। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়।
উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension) রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, যা হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক ও কিডনির ক্ষতি করে।
হৃদরোগ (Cardiovascular Diseases) যেমন - করোনারি আর্টারি ডিজিজ, হার্ট অ্যাটাক ইত্যাদি।
স্থূলতা (Obesity) শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমা। এটি অন্যান্য অনেক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
ক্যান্সার (Cancer) কোষের অনিয়ন্ত্রিত বিভাজন। ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি এর ঝুঁকি বাড়ায়। অনকোজিন (Oncogene) নামক জিন ক্যান্সারের জন্য দায়ী।
বাত বা আর্থ্রাইটিস (Arthritis) হাড়ের সংযোগস্থলে (Joints) প্রদাহ ও ব্যথা হয়।
অস্টিওপোরোসিস (Osteoporosis) হাড়ের ঘনত্ব কমে গিয়ে হাড় ভঙ্গুর হয়ে যায়। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন D-র অভাব এবং বার্ধক্য এর প্রধান কারণ।