CLASS NO: 02
রোগের শ্রেণীবিভাগ (Classification of Diseases)
রোগগুলিকে ভালোভাবে বোঝা, তাদের কারণ নির্ণয়, চিকিৎসা এবং প্রতিরোধের সুবিধার জন্য বিভিন্ন উপায়ে শ্রেণীবিভাগ করা হয়। প্রধানত দুটি মূল ভিত্তির উপর এই শ্রেণীবিভাগ করা হয়:
- জীবাণু বা সংক্রামক এজেন্টের উপর ভিত্তি করে (Based on Pathogen/Infectious Agent)
- সংক্রমণের পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে (Based on Mode of Transmission)
A. জীবাণু বা সংক্রামক এজেন্টের উপর ভিত্তি করে বিস্তারিত আলোচনা
যেসব রোগ কোনো নির্দিষ্ট জীবাণু (Pathogen) দ্বারা শরীরে সৃষ্ট হয়, তাদের এই ভাগে ফেলা হয়। পরীক্ষার জন্য এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
১. ভাইরাস ঘটিত রোগ (Viral Diseases)
- সংজ্ঞা: ভাইরাস নামক অ-কোষীয়, অতি আণুবীক্ষণিক জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট রোগ। ভাইরাস জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ের বস্তু।
- গুরুত্বপূর্ণ রোগসমূহ:
- AIDS (এইডস): HIV (Human Immunodeficiency Virus) দ্বারা সৃষ্ট। এটি মানুষের অনাক্রম্যতা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়।
- পোলিও (Polio): পোলিও ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট। এটি মূলত স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে এবং পঙ্গুত্বের কারণ হতে পারে।
- ডেঙ্গু (Dengue): ফ্ল্যাভিভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট। এডিস মশার কামড়ে ছড়ায়। একে 'হাড় ভাঙা জ্বর' (Break-bone fever) বলা হয়।
- জিকা (Zika): জিকা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট এবং এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়।
- ইনফ্লুয়েঞ্জা (Influenza): ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট একটি শ্বসনতন্ত্রের রোগ।
- সাধারণ সর্দি-কাশি (Common Cold): রাইনোভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট।
- হাম (Measles): রুবেলা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ।
- জলবসন্ত (Chicken Pox): ভ্যারিসেলা-জোস্টার ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট।
- গুটিবসন্ত (Smallpox): ভ্যারিওলা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট (বর্তমানে পৃথিবী থেকে নির্মূল)।
- জলাতঙ্ক (Rabies): র্যাবডোভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট। সংক্রামিত পশুর (যেমন কুকুর) কামড়ে ছড়ায়।
- হেপাটাইটিস (Hepatitis): হেপাটাইটিস ভাইরাস (A, B, C, D, E) দ্বারা যকৃতের প্রদাহজনিত রোগ।
২. ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ (Bacterial Diseases)
- সংজ্ঞা: ব্যাকটেরিয়া নামক এককোষী, প্রোক্যারিওটিক অণুজীব দ্বারা সৃষ্ট রোগ।
- গুরুত্বপূর্ণ রোগসমূহ:
- যক্ষ্মা বা টিবি (Tuberculosis - TB): Mycobacterium tuberculosis নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট। এটি মূলত ফুসফুসকে আক্রমণ করে।
- কলেরা (Cholera): Vibrio cholerae নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট। এটি একটি জলবাহিত রোগ।
- টাইফয়েড (Typhoid): Salmonella typhi ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট। এটিও একটি জলবাহিত রোগ।
- ডিপথেরিয়া (Diphtheria): Corynebacterium diphtheriae দ্বারা সৃষ্ট। এটি গলা ও শ্বাসনালিকে আক্রমণ করে।
- টিটেনাস বা ধনুষ্টঙ্কার (Tetanus): Clostridium tetani ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট। এটি স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে।
- নিউমোনিয়া (Pneumonia): Streptococcus pneumoniae বা অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া দ্বারা ফুসফুসের সংক্রমণ।
- কুষ্ঠ (Leprosy): Mycobacterium leprae দ্বারা সৃষ্ট। এটি ত্বক, স্নায়ু ও চোখকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একে হ্যানসেনের রোগও বলা হয়।
- হুপিং কাশি (Whooping Cough): Bordetella pertussis দ্বারা সৃষ্ট শ্বাসনালির রোগ।
- সিফিলিস (Syphilis) ও গনোরিয়া (Gonorrhoea): এগুলি যৌন সংসর্গের মাধ্যমে ছড়ানো ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ।
৩. প্রোটোজোয়া বা আদ্যপ্রাণী ঘটিত রোগ (Protozoan Diseases)
- সংজ্ঞা: প্রোটোজোয়া বা আদ্যপ্রাণী নামক এককোষী, ইউক্যারিওটিক অণুজীব দ্বারা সৃষ্ট রোগ।
- গুরুত্বপূর্ণ রোগসমূহ:
- ম্যালেরিয়া (Malaria): Plasmodium (ভাইভ্যাক্স, ফ্যালসিপেরাম ইত্যাদি) নামক পরজীবী দ্বারা সৃষ্ট। স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা এর ভেক্টর বা বাহক।
- কালাজ্বর (Kala-azar): Leishmania donovani নামক পরজীবী দ্বারা সৃষ্ট। বেলেমাছি (Sandfly) এর বাহক। একে 'দমদম জ্বর'ও বলা হয়।
- অ্যামিবিয়াসিস বা আমাশয় (Amoebiasis): Entamoeba histolytica নামক পরজীবী দ্বারা সৃষ্ট। দূষিত জল ও খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়।
- ঘুম রোগ (Sleeping Sickness): Trypanosoma নামক পরজীবী দ্বারা সৃষ্ট। সেটসি মাছি (Tsetse fly) এর বাহক।
৪. ছত্রাক ঘটিত রোগ (Fungal Diseases / Mycoses)
- সংজ্ঞা: ছত্রাক (Fungus) দ্বারা সৃষ্ট রোগ।
- গুরুত্বপূর্ণ রোগসমূহ:
- দাদ (Ringworm): বিভিন্ন প্রকার ছত্রাক দ্বারা সৃষ্ট ত্বকের সংক্রমণ।
- অ্যাথলেট'স ফুট (Athlete's Foot): পায়ের পাতার ত্বকে ছত্রাকের সংক্রমণ।
- ক্যানডিডিয়াসিস (Candidiasis): Candida albicans নামক ইস্ট দ্বারা সৃষ্ট সংক্রমণ।
৫. কৃমি ঘটিত রোগ (Helminthic Diseases)
- সংজ্ঞা: পরজীবী কৃমি দ্বারা সৃষ্ট রোগ।
- গুরুত্বপূর্ণ রোগসমূহ:
- ফাইলেরিয়াসিস বা গোদ (Filariasis): Wuchereria bancrofti নামক গোলকৃমি দ্বারা সৃষ্ট। কিউলেক্স মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এতে পা ফুলে হাতির পায়ের মতো হয়ে যায়।
- টিনিয়েসিস (Taeniasis): ফিতাকৃমি (Taenia solium) দ্বারা সৃষ্ট রোগ।
- অ্যাসকেরিয়েসিস (Ascariasis): গোলকৃমি (Ascaris lumbricoides) দ্বারা সৃষ্ট রোগ।
B. সংক্রমণের পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে বিস্তারিত আলোচনা
১. সংক্রামক রোগ (Communicable / Infectious Diseases)
সংজ্ঞা: যে সমস্ত রোগ একজন সংক্রামিত ব্যক্তি বা প্রাণী থেকে অন্য সুস্থ ব্যক্তি বা প্রাণীর দেহে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সঞ্চারিত হতে পারে, তাদের সংক্রামক রোগ বলে। উপরে উল্লিখিত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, প্রোটোজোয়া, ছত্রাক ও কৃমি ঘটিত প্রায় সব রোগই সংক্রামক।
২. অসংক্রামক রোগ (Non-Communicable / Non-Infectious Diseases)
- সংজ্ঞা: যে সমস্ত রোগ এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়ায় না, তাদের অসংক্রামক রোগ বলে। এগুলি মূলত জীবনযাত্রা, জিনগত কারণ বা পরিবেশের প্রভাবে হয়ে থাকে।
- এর প্রধান কয়েকটি ভাগ হলো:
- অভাবজনিত রোগ (Deficiency Diseases): খাদ্যতালিকায় কোনো নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের অভাবে হয়। যেমন - কোয়াশিয়রকর (প্রোটিনের অভাব), অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা (আয়রনের অভাব), গলগন্ড (আয়োডিনের অভাব), স্কার্ভি (ভিটামিন C-এর অভাব)।
- বংশগত বা জেনেটিক রোগ (Hereditary Diseases): জিনগত ত্রুটির কারণে বংশ পরম্পরায় বাহিত হয়। যেমন - হিমোফিলিয়া, বর্ণান্ধতা, থ্যালাসেমিয়া।
- দূষণজনিত রোগ (Pollution-related Diseases): পরিবেশ দূষণের কারণে সৃষ্ট হয়। যেমন - মিনামাটা (পারদ দূষণ), ইটাই-ইটাই (ক্যাডমিয়াম দূষণ), ব্ল্যাক ফুট ডিজিজ (আর্সেনিক দূষণ), সিলিকোসিস (সিলিকা কণার প্রভাব)।
- হরমোনের অস্বাভাবিকতা জনিত রোগ (Hormonal Disorders): হরমোনের কম বা বেশি ক্ষরণের ফলে হয়। যেমন - ডায়াবেটিস বা মধুমেহ (ইনসুলিনের অভাব), বামনত্ব বা অতিকায়ত্ব (বৃদ্ধি হরমোনের অসামঞ্জস্য)।
- ক্যান্সার (Cancer): কোষের অনিয়ন্ত্রিত বিভাজনের ফলে সৃষ্ট রোগ। এটি অসংক্রামক।
- হৃদরোগ (Cardiovascular Diseases): যেমন - উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক।
- বাত বা আর্থ্রাইটিস (Arthritis): হাড়ের সংযোগস্থলে প্রদাহজনিত রোগ।