অধ্যায়: স্নায়ুতন্ত্রের বিস্তারিত বিবরণ

দিন/রাত

CLASS NO: 05

১. কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (Central Nervous System - CNS)

(ক) মস্তিষ্ক (Brain)

ভূমিকা: মস্তিষ্ক হলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের প্রধান এবং সবচেয়ে জটিল অংশ। এটি আমাদের দেহের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র বা "কমান্ড সেন্টার"। সমস্ত চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি এবং ঐচ্ছিক কাজ এখানেই নিয়ন্ত্রিত হয়।

অবস্থান ও সুরক্ষা: মস্তিষ্ক মাথার খুলি বা করোটি (Cranium)-এর মধ্যে সুরক্ষিত থাকে। এটি মেনিনজেস (Meninges) নামক একটি ত্রিস্তরীয় পর্দা এবং সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (CSF) দ্বারা আবৃত থাকে, যা একে পুষ্টি জোগায় এবং আঘাত থেকে রক্ষা করে।

প্রধান অংশ এবং তাদের কাজ:
  1. অগ্রমস্তিষ্ক (Forebrain):
    • গুরুমস্তিষ্ক বা সেরিব্রাম (Cerebrum): এটি মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় অংশ। এর দুটি গোলার্ধ (Hemisphere) করপাস ক্যালোসাম (Corpus Callosum) নামক স্নায়ুযোজক দ্বারা যুক্ত থাকে।
      • কাজ: চিন্তা, বুদ্ধি, স্মৃতি, ইচ্ছাশক্তি, শেখা, ব্যক্তিত্ব, ভাষা এবং পঞ্চইন্দ্রিয় থেকে আসা অনুভূতি (যেমন—দর্শন, শ্রবণ) বিশ্লেষণ করা।
    • থ্যালামাস (Thalamus): এটি গুরুমস্তিষ্কের নিচে অবস্থিত।
      • কাজ: এটি ঘ্রাণ ছাড়া অন্যান্য সংবেদী পথের রিলে স্টেশন (Relay Station) হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ, বিভিন্ন সংবেদী সংকেত মস্তিষ্কে যাওয়ার পথে এখানে থামে এবং তারপর নির্দিষ্ট স্থানে প্রেরিত হয়। এটি আবেগ নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে।
    • হাইপোথ্যালামাস (Hypothalamus): এটি থ্যালামাসের নিচে অবস্থিত।
      • কাজ: দেহের তাপমাত্রা, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ঘুম, রক্তচাপ এবং বিভিন্ন আবেগ (যেমন—আনন্দ, ভয়, রাগ) নিয়ন্ত্রণ করে। এটি পিটুইটারি গ্রন্থিকে নিয়ন্ত্রণ করে বলে একে "প্রভুগ্রন্থির প্রভু" (Master of the Master Gland) বলা হয়।
  2. মধ্যমস্তিষ্ক (Midbrain): এটি অগ্র এবং পশ্চাৎ মস্তিষ্কের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।
    • কাজ: দর্শন ও শ্রবণ সম্পর্কিত প্রতিবর্ত ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন, হঠাৎ তীব্র শব্দে চমকে ওঠা বা তীব্র আলোতে চোখ বন্ধ করা।
  3. পশ্চাৎমস্তিষ্ক (Hindbrain):
    • লঘুমস্তিষ্ক বা সেরিবেলাম (Cerebellum): এটি গুরুমস্তিষ্কের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশ।
      • কাজ: দেহের ভারসাম্য রক্ষা করা এর প্রধান কাজ। হাঁটা, দৌঁড়ানো, সাইকেল চালানো এবং অন্যান্য সূক্ষ্ম ঐচ্ছিক পেশির কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
    • পনস বা যোজক (Pons): এটি লঘুমস্তিষ্ক, সুষুম্নাশীর্ষক এবং মধ্যমস্তিষ্কের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।
      • কাজ: শ্বাসক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
    • সুষুম্নাশীর্ষক বা মেডুলা অবলংগাটা (Medulla Oblongata): এটি মস্তিষ্কের সবচেয়ে নিচের অংশ, যা সুষুম্নাকাণ্ডের সাথে যুক্ত।
      • কাজ: হৃৎস্পন্দন, শ্বাসক্রিয়া, রক্তচাপ, খাদ্য গলাধঃকরণ, কাশি, হাঁচি-র মতো গুরুত্বপূর্ণ অনৈচ্ছিক কাজগুলি নিয়ন্ত্রণ করে।

(খ) সুষুম্নাকাণ্ড (Spinal Cord)

ভূমিকা: এটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের দ্বিতীয় অংশ, যা মস্তিষ্ক এবং প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।

অবস্থান ও সুরক্ষা: এটি মেরুদণ্ডের অস্থি বা কশেরুকা (Vertebrae) দ্বারা গঠিত নালির মধ্যে সুরক্ষিত থাকে।

কাজ:
  1. সংকেত পরিবহন: এটি দেহ থেকে সংবেদী সংকেত মস্তিষ্কে এবং মস্তিষ্ক থেকে আজ্ঞাবহ সংকেত দেহে পৌঁছে দেওয়ার প্রধান পথ হিসেবে কাজ করে।
  2. প্রতিবর্ত ক্রিয়ার কেন্দ্র: এটি অধিকাংশ প্রতিবর্ত ক্রিয়া (Reflex Action) নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে মস্তিষ্ক পর্যন্ত সংকেত না পাঠিয়েও খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া করা সম্ভব হয়।

২. প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র (Peripheral Nervous System - PNS)

(ক) করোটি স্নায়ু (Cranial Nerves)

ভূমিকা: যে সমস্ত স্নায়ু সরাসরি মস্তিষ্ক থেকে উৎপন্ন হয়ে দেহের বিভিন্ন অংশে, বিশেষত মাথা ও ঘাড়ে বিস্তৃত হয়, তাদের করোটি স্নায়ু বলে।

সংখ্যা: মানুষের ১২ জোড়া করোটি স্নায়ু রয়েছে।

কাজ ও প্রকার:

(খ) সুষুম্না স্নায়ু (Spinal Nerves)

ভূমিকা: যে সমস্ত স্নায়ু সুষুম্নাকাণ্ড থেকে উৎপন্ন হয়ে দেহকাণ্ড ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে, তাদের সুষুম্না স্নায়ু বলে।

সংখ্যা: মানুষের ৩১ জোড়া সুষুম্না স্নায়ু রয়েছে।

কাজ ও প্রকার:

৩. স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র (Autonomic Nervous System - ANS)

(ক) সমবেদী বা সিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র (Sympathetic Nervous System)

ভূমিকা: এটি স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের একটি অংশ, যা শরীরকে জরুরী অবস্থার জন্য প্রস্তুত করে।

মূলমন্ত্র: "ফাইট অর ফ্লাইট" (Fight or Flight)

কাজ:

(খ) পরাসমবেদী বা প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র (Parasympathetic Nervous System)

ভূমিকা: এটি স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের অপর অংশ, যা শরীরকে শান্ত করে এবং শক্তি সংরক্ষণ করে। এর কাজ সিমপ্যাথেটিক তন্ত্রের ঠিক বিপরীত।

মূলমন্ত্র: "রেস্ট অ্যান্ড ডাইজেস্ট" (Rest and Digest)

কাজ: