CLASS NO: 02
ভূমিকা
নিউরোন হলো স্নায়ুতন্ত্রের গঠনগত ও কার্যগত একক। মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ১০ শত কোটি (10 billion) নিউরোন থাকে। এর প্রধান কাজ হলো পরিবেশ বা দেহের ভেতর থেকে উদ্দীপনা গ্রহণ করা, সেই উদ্দীপনাকে তড়িৎ-রাসায়নিক সংকেতে (Nerve Impulse) রূপান্তরিত করা এবং তাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহন করা। এদের বিভাজন ক্ষমতা নেই, কারণ এদের কোশদেহে সেন্ট্রোজোম নিষ্ক্রিয় থাকে।
১. নিউরোনের গঠন (Structure of a Neuron)
একটি আদর্শ নিউরোনকে প্রধানত দুটি অংশে ভাগ করা যায়:
- (ক) কোশদেহ বা সোমা (Cell Body or Soma/Cyton)
- (খ) প্রবর্ধক বা প্রসেস (Processes)
(ক) কোশদেহ (Cell Body)
এটি নিউরোনের প্রধান, তারার মতো বা গোলাকার অংশ, যা বিপাকীয় ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এর বিভিন্ন অংশ হলো:
- নিউক্লিয়াস (Nucleus): এটি কোশদেহের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং নিউরোনের সমস্ত কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
- সাইটোপ্লাজম বা নিউরোপ্লাজম (Cytoplasm or Neuroplasm): নিউক্লিয়াসকে ঘিরে থাকা সাইটোপ্লাজমকে নিউরোপ্লাজম বলে। এতে বিভিন্ন কোশ অঙ্গাণু থাকে।
- নিসল দানা (Nissl Bodies): এটি নিউরোনের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। নিউরোপ্লাজমে ছড়িয়ে থাকা এই দানাগুলি আসলে রাইবোনিউক্লিওপ্রোটিন (RNA ও প্রোটিন) দ্বারা গঠিত। এর প্রধান কাজ হলো প্রোটিন সংশ্লেষ করা, যা নিউরোনের বৃদ্ধি ও মেরামতির জন্য ضروری। (MCQ-এর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ)।
- অন্যান্য অঙ্গাণু: মাইটোকন্ড্রিয়া (শক্তি উৎপাদনের জন্য), গলগি বডি, নিউরোফাইব্রিল (কোশের আকৃতি বজায় রাখে) ইত্যাদি থাকে।
- সেন্ট্রোজোম (Centrosome): পরিণত নিউরোনে সেন্ট্রোজোম নিষ্ক্রিয় থাকে বা অনুপস্থিত থাকে। একারণে নিউরোন বিভাজিত হতে পারে না। কোনো নিউরোন নষ্ট হলে তা পুনরায় তৈরি হয় না।
(খ) প্রবর্ধক (Processes)
কোশদেহ থেকে নির্গত শাখা-প্রশাখাগুলিকে প্রবর্ধক বলে। এগুলি দুই প্রকার:
১. ডেনড্রন (Dendron)
- গঠন: এগুলি কোশদেহ থেকে সৃষ্ট ছোট, শাখাপ্রশাখা যুক্ত প্রবর্ধক। ডেনড্রনের সূক্ষ্ম শাখাগুলিকে ডেনড্রাইট (Dendrite) বলে।
- কাজ: এর প্রধান কাজ হলো পূর্ববর্তী নিউরোন বা গ্রাহক অঙ্গ থেকে স্নায়ু উদ্দীপনা গ্রহণ করে কোশদেহে প্রেরণ করা। এগুলিকে নিউরোনের "অ্যান্টেনা" বলা যেতে পারে।
২. অ্যাক্সন (Axon)
- গঠন: এটি কোশদেহ থেকে সৃষ্ট একটি দীর্ঘ এবং সাধারণত শাখাবিহীন প্রবর্ধক। প্রতিটি নিউরোনে একটি মাত্র অ্যাক্সন থাকে।
- কাজ: এর প্রধান কাজ হলো কোশদেহ থেকে স্নায়ু উদ্দীপনাকে দূরে পরবর্তী নিউরোনে বা কারক অঙ্গে (পেশি বা গ্রন্থি) পৌঁছে দেওয়া। এটি নিউরোনের "ট্রান্সমিশন কেবল" (Transmission Cable)-এর মতো কাজ করে।
অ্যাক্সনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ (MCQ Hotspot):
- অ্যাক্সোপ্লাজম (Axoplasm): অ্যাক্সনের ভিতরের সাইটোপ্লাজম।
- অ্যাক্সোলেমা (Axolemma): অ্যাক্সনের বাইরের আবরণী বা প্লাজমা পর্দা।
- মায়োলিন সিদ্ (Myelin Sheath): অনেক নিউরোনের অ্যাক্সন সোয়ান কোশ (Schwann Cell) দ্বারা সৃষ্ট স্নেহপদার্থের একটি স্তর দিয়ে আবৃত থাকে, একে মায়োলিন সিদ্ বলে।
- কাজ: এটি অন্তরক বা ইনসুলেটর হিসেবে কাজ করে এবং স্নায়ু উদ্দীপনার পরিবহনের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মায়োলিন থাকার কারণে স্নায়ুকে দেখতে সাদা রঙের হয় (White Matter)।
- রানভিয়ারের পর্ব (Node of Ranvier): মায়োলিন সিদের মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্বে যে খাঁজ বা পর্ব দেখা যায়, তাকে রানভিয়ারের পর্ব বলে।
- সলটেটরি কন্ডাকশন (Saltatory Conduction): মায়োলিনযুক্ত স্নায়ুতে উদ্দীপনা এক পর্ব থেকে অন্য পর্বে লাফিয়ে লাফিয়ে যায়, একে সলটেটরি কন্ডাকশন বা লম্ফজনিত পরিবহন বলে। এর ফলে খুব দ্রুত (প্রায় 120 m/s) সংকেত পরিবাহিত হয়। (MCQ-এর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ)
- অ্যাক্সন টার্মিনাল বা প্রান্তবুরুশ (Axon Terminal or End Brush): অ্যাক্সনের শেষ প্রান্তে থাকা শাখান্বিত অংশ। এর শেষ প্রান্তে সাইন্যাপটিক নব (Synaptic Knob) থাকে, যার মধ্যে নিউরোট্রান্সমিটার (যেমন - অ্যাসিটাইলকোলিন) জমা থাকে।
২. নিউরোনের প্রকারভেদ (Types of Neurons)
নিউরনকে মূলত দুটি ভিত্তিতে ভাগ করা যায়:
(ক) গঠন বা প্রবর্ধকের সংখ্যার ভিত্তিতে:
- মেরুবিহীন (Apolar): কোনো প্রবর্ধক থাকে না। (যেমন: অমরার কোশ)
- একমেরু বা ইউনিপোলার (Unipolar): একটি মাত্র প্রবর্ধক থাকে। (যেমন: অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের স্নায়ুকোশ)
- দ্বিমেরু বা বাইপোলার (Bipolar): একটি অ্যাক্সন ও একটি ডেনড্রন থাকে। (যেমন: চোখের রেটিনা, কানের অন্তঃকর্ণ)
- বহুমেরু বা মাল্টিপোলার (Multipolar): একটি অ্যাক্সন এবং একাধিক ডেনড্রন থাকে। (যেমন: মানুষের মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্সের নিউরোন, যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়)
(খ) কাজের ভিত্তিতে (এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ):
| প্রকার |
অপর নাম |
কাজ |
উদাহরণ |
| ১. সংজ্ঞাবহ নিউরোন |
সেনসরি বা অ্যাফারেন্ট (Sensory/Afferent) |
গ্রাহক অঙ্গ (ত্বক, চোখ, কান) থেকে অনুভূতি বা সংকেত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে (মস্তিষ্ক/সুষুম্নাকাণ্ড) নিয়ে আসে। |
অপটিক স্নায়ুর নিউরোন (চোখ থেকে মস্তিষ্কে) |
| ২. আজ্ঞাবহ নিউরোন |
মোটর বা ইফারেন্ট (Motor/Efferent) |
কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র থেকে আজ্ঞা বা নির্দেশ কারক অঙ্গে (পেশি, গ্রন্থি) নিয়ে যায়। |
অকিউলোমোটর স্নায়ুর নিউরোন (মস্তিষ্ক থেকে চোখের পেশিতে) |
| ৩. সহযোগী নিউরোন |
ইন্টারনিউরোন বা অ্যাডজাস্টর (Interneuron/Adjustor) |
সংজ্ঞাবহ ও আজ্ঞাবহ নিউরোনের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে এবং সমন্বয় সাধন করে। |
মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাণ্ডের মধ্যে অবস্থিত নিউরোন |