১. বার্নোলির উপপাদ্যের প্রয়োগ (অব্যাহত)
স্প্রেয়ার বা অ্যাটোমাইজারের কার্যনীতি
স্প্রেয়ারের পিস্টন চাপলে একটি সরু নলের মুখের উপর দিয়ে বাতাস দ্রুত বেগে বেরিয়ে যায়। বার্নোলির নীতি অনুযায়ী, দ্রুত বায়ুপ্রবাহের কারণে ওই স্থানে চাপ কমে যায়। পাত্রের ভেতরে থাকা তরলের উপর বায়ুমণ্ডলীয় চাপ বেশি থাকায়, সেই চাপে তরল সরু নল বেয়ে উপরে উঠে আসে এবং বায়ুপ্রবাহের সাথে মিশে সূক্ষ্ম কণার আকারে ছড়িয়ে পড়ে।
দ্রুতগামী ট্রেনের কাছে দাঁড়ানো বিপজ্জনক কেন?
দ্রুতগামী ট্রেনের কাছাকাছি বায়ুর বেগ অনেক বেশি থাকে, ফলে সেখানে বায়ুর চাপ কমে যায়। কিন্তু কিছুটা দূরে থাকা স্থির বায়ুর চাপ বেশি থাকে। এই চাপের পার্থক্যের কারণে একটি বল সৃষ্টি হয়, যা মানুষকে ট্রেনের দিকে ঠেলে দেয়। এজন্য দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
উড়োজাহাজের উড্ডয়ন
উড়োজাহাজের ডানার উপরের পৃষ্ঠটি উত্তল এবং নিচের পৃষ্ঠটি সমতল হয়। এই বিশেষ গঠনের কারণে ডানার উপর দিয়ে বায়ু দ্রুত বেগে এবং নিচ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম বেগে প্রবাহিত হয়। ফলে ডানার উপরে চাপ কমে এবং নিচে চাপ বেশি থাকে। এই চাপের পার্থক্য একটি ঊর্ধ্বমুখী বল (Lift) তৈরি করে, যা উড়োজাহাজকে আকাশে ভেসে থাকতে সাহায্য করে।
২. স্থিতিস্থাপকতা (Elasticity)
সংজ্ঞা: যে ধর্মের জন্য কোনো বস্তু বাইরে থেকে প্রযুক্ত বলের প্রভাবে তার আকার বা আয়তনের পরিবর্তনকে বাধা দেয় এবং প্রযুক্ত বল সরিয়ে নিলে তার পূর্বের আকার ও আয়তন ফিরে পায়, তাকে স্থিতিস্থাপকতা বলে।
স্থিতিস্থাপক সীমা (Elastic Limit): প্রযুক্ত বলের যে সর্বোচ্চ মান পর্যন্ত কোনো বস্তু পূর্ণ স্থিতিস্থাপক আচরণ করে, সেই মানকে স্থিতিস্থাপক সীমা বলে। এই সীমার বাইরে বল প্রয়োগ করলে বস্তুটির স্থায়ী বিকৃতি ঘটে।
বস্তুর প্রকারভেদ
- পূর্ণ স্থিতিস্থাপক বস্তু (Perfectly Elastic): বল সরিয়ে নিলে যে বস্তু সম্পূর্ণরূপে পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। বাস্তবে এমন বস্তু নেই।
- পূর্ণ অস্থিতিস্থাপক বা নমনীয় বস্তু (Perfectly Plastic/Inelastic): বল সরিয়ে নিলেও যে বস্তু বিকৃত অবস্থাতেই থেকে যায়। যেমন: কাদা মাটি, মাখন।
- আংশিক স্থিতিস্থাপক বস্তু: বাস্তবে আমরা যে সকল বস্তু দেখি, তার সবই আংশিক স্থিতিস্থাপক।
৩. পীড়ন (Stress) ও বিকৃতি (Strain)
| বিষয় | পীড়ন (Stress) | বিকৃতি (Strain) |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | বাহ্যিক বলের প্রভাবে বস্তুর ভেতরে প্রতি একক ক্ষেত্রফলে যে প্রতিরোধকারী বলের উদ্ভব হয়, তাকে পীড়ন বলে। | বাহ্যিক বলের প্রভাবে বস্তুর আকার বা আয়তনের যে আনুপাতিক পরিবর্তন হয়, তাকে বিকৃতি বলে। |
| সূত্র | পীড়ন = বল / ক্ষেত্রফল | বিকৃতি = পরিবর্তন / প্রাথমিক মাত্রা |
| একক ও মাত্রা | এর একক (N/m², dyne/cm²) ও মাত্রা ([ML⁻¹T⁻²]) আছে। | এটি একক ও মাত্রাহীন একটি অনুপাত। |
৪. হুকের সূত্র (Hooke's Law)
সূত্র: স্থিতিস্থাপক সীমার মধ্যে কোনো বস্তুর পীড়ন তার বিকৃতির সমানুপাতিক।
পীড়ন / বিকৃতি = ধ্রুবক (K)
এই ধ্রুবকটিকে বস্তুর উপাদানের স্থিতিস্থাপক গুণাঙ্ক (Modulus of Elasticity) বলে।
ইয়ং গুণাঙ্ক (Young's Modulus)
স্থিতিস্থাপক সীমার মধ্যে অনুদৈর্ঘ্য পীড়ন ও অনুদৈর্ঘ্য বিকৃতির অনুপাতকে ইয়ং গুণাঙ্ক (Y) বলে। এটি শুধুমাত্র কঠিন পদার্থের ধর্ম।
Y = অনুদৈর্ঘ্য পীড়ন / অনুদৈর্ঘ্য বিকৃতি
"রবার অপেক্ষা ইস্পাত বেশি স্থিতিস্থাপক" - ব্যাখ্যা
কোনো বস্তুর উপর নির্দিষ্ট পরিমাণ বল প্রয়োগে যার বিকৃতি যত কম হয়, সেটি তত বেশি স্থিতিস্থাপক। একই বল প্রয়োগ করলে রবারের বিকৃতি ইস্পাতের চেয়ে অনেক বেশি হয়। তাই পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়, ইস্পাত রবারের চেয়ে বেশি স্থিতিস্থাপক।
৫. পদার্থের বিভিন্ন ধর্ম
- ভঙ্গুরতা (Brittleness): যে ধর্মের জন্য কোনো বস্তু স্থিতিস্থাপক সীমা ছাড়িয়ে গেলে সামান্য বিকৃতিতে ভেঙে যায়। যেমন: কাচ।
- প্রসার্যতা (Ductility): যে ধর্মের জন্য কোনো বস্তুকে স্থিতিস্থাপক সীমা ছাড়িয়ে বল প্রয়োগ করলেও না ভেঙে সরু তারে পরিণত করা যায়। যেমন: সোনা, তামা।
- নমনীয়তা (Malleability): যে ধর্মের জন্য কোনো বস্তুকে পিটিয়ে পাতলা পাতে পরিণত করা যায়। যেমন: লোহা, অ্যালুমিনিয়াম।
৬. গাণিতিক সমস্যা ও সমাধান
প্রশ্ন ১: একটি স্প্রিংয়ের নিম্নপ্রান্ত থেকে 4 কেজি ওজন ঝোলালে স্প্রিংয়ের 2 সেমি দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি হয়। স্প্রিংটির বলধ্রুবক (k) কত?
ধাপ ১ (বল নির্ণয়): প্রযুক্ত বল (F) = mg = 4 kg × 9.8 m/s² = 39.2 N
ধাপ ২ (দৈর্ঘ্য পরিবর্তন): দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি (x) = 2 cm = 0.02 m
ধাপ ৩ (বলধ্রুবক নির্ণয়): k = F/x = 39.2 N / 0.02 m = 1960 N/m
প্রশ্ন ২: 30 মিটার দীর্ঘ এবং 2 × 10⁻⁶ m² প্রস্থচ্ছেদের একটি তারের এক প্রান্তে 5 কেজি ওজন ঝোলালে তারের দৈর্ঘ্য 0.49 × 10⁻² m বাড়ে। ইয়ং গুণাঙ্ক নির্ণয় করো।
ধাপ ১ (পীড়ন নির্ণয়):
বল (F) = mg = 5 kg × 9.8 m/s² = 49 N
প্রস্থচ্ছেদ (A) = 2 × 10⁻⁶ m²
পীড়ন = F/A = 49 / (2 × 10⁻⁶) = 2.45 × 10⁷ N/m²
ধাপ ২ (বিকৃতি নির্ণয়):
দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি (ΔL) = 0.49 × 10⁻² m
প্রাথমিক দৈর্ঘ্য (L) = 30 m
বিকৃতি = ΔL/L = (0.49 × 10⁻²) / 30 ≈ 1.63 × 10⁻⁴
ধাপ ৩ (ইয়ং গুণাঙ্ক নির্ণয়):
Y = পীড়ন / বিকৃতি = (2.45 × 10⁷) / (1.63 × 10⁻⁴) ≈ 1.5 × 10¹¹ N/m²