অধ্যায়: উদ্ভিদ হরমোন (Phytohormone)

দিন/রাত

CLASS NO: 01

ভূমিকা (Introduction)

উদ্ভিদের জীবনে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজ, যেমন - বৃদ্ধি, বিকাশ, ফুল ফোটা, ফল ধরা, বীজ তৈরি ইত্যাদি সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। এই সমস্ত কাজ নিয়ন্ত্রণের জন্য উদ্ভিদের দেহে এক বিশেষ ধরনের জৈব-রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয়, যা খুব অল্প ঘনত্বে কার্যকরী। এই পদার্থগুলোকেই হরমোন বা ফাইটোহরমোন (Phytohormone) বলা হয়।

সংজ্ঞা (Definition)

যে জৈব-রাসায়নিক পদার্থ উদ্ভিদ কোষের নির্দিষ্ট স্থান থেকে (যেমন- ভাজক কলা) উৎপন্ন হয়ে ব্যাপন বা সংবহন কলার মাধ্যমে দেহের দূরবর্তী স্থানে বাহিত হয় এবং সেখানকার কোষগুলির কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে উদ্ভিদ হরমোন বা ফাইটোহরমোন বলে। এদের রাসায়নিক সমন্বয়ক (Chemical Coordinator)-ও বলা হয়।

উদ্ভিদ হরমোনের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Plant Hormones)

  1. উৎস (Source): উদ্ভিদ হরমোন প্রধানত বর্ধনশীল অঞ্চলের ভাজক কলা (meristematic tissue), যেমন - কাণ্ড ও মূলের অগ্রভাগ, ভ্রূণমুকুল, কচি পাতা, ফুলের মুকুল এবং ফলের মধ্যে উৎপন্ন হয়।
  2. রাসায়নিক প্রকৃতি (Chemical Nature): এরা সাধারণত জৈব অম্ল (organic acid), ক্ষার (base) বা গ্যাসীয় পদার্থ হয়। যেমন - অক্সিন (ইন্দোল বর্গীয়), জিব্বেরেলিন (টারপিনয়েড), সাইটোকাইনিন (অ্যাডেনিন জাতীয়), ইথিলিন (গ্যাসীয়)।
  3. পরিবহণ (Transport): কিছু হরমোন (যেমন- অক্সিন) উৎপত্তিস্থল থেকে মেরুবর্তী পরিবহণ (Polar transport) পদ্ধতিতে পরিবাহিত হয়, অর্থাৎ কাণ্ডের অগ্রভাগ থেকে নীচের দিকে যায়। অন্য হরমোনগুলি জাইলেম ও ফ্লোয়েম কলার মাধ্যমে উদ্ভিদের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
  4. কার্যকারিতা (Function): এরা খুব কম ঘনত্বে (যেমন- 1 ppm বা পার্টস পার মিলিয়ন) কার্যকরী। ঘনত্বের পরিবর্তন হলে এদের কার্যকারিতাও বদলে যায়। বেশি ঘনত্বে অনেক হরমোন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
  5. দ্বৈত ভূমিকা (Dual Role): কিছু হরমোন নির্দিষ্ট ঘনত্বে উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে, আবার ঘনত্ব বেড়ে গেলে সেই বৃদ্ধি ব্যাহত করে।
  6. ধ্বংস (Destruction): হরমোনগুলি কাজ শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন উৎসেচকের প্রভাবে বা আলোর উপস্থিতিতে নষ্ট হয়ে যায়।

উদ্ভিদ হরমোনের প্রকারভেদ (Classification of Plant Hormones)

উদ্ভিদ হরমোনকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:

প্রধান হরমোনগুলির বিস্তারিত আলোচনা

১. অক্সিন (Auxin)

রাসায়নিক নাম: ইন্ডোল অ্যাসিটিক অ্যাসিড (IAA)।

উৎস: কাণ্ড ও মূলের অগ্রভাগের ভাজক কলা, ভ্রূণমুকুল আবরণী, কচি পাতা।

কাজ বা ভূমিকা (Functions):

২. জিব্বেরেলিন (Gibberellin)

রাসায়নিক নাম: জিব্বেরেলিক অ্যাসিড (GA)।

উৎস: পরিপক্ক বীজ, অঙ্কুরিত চারা, মুকুল, কচি পাতা।

কাজ বা ভূমিকা (Functions):

৩. সাইটোকাইনিন (Cytokinin)

রাসায়নিক নাম: কাইনেটিন (একটি কৃত্রিম সাইটোকাইনিন), জিয়েটিন (একটি প্রাকৃতিক সাইটোকাইনিন)।

উৎস: ফল ও শস্য, নারকেলের তরল শস্য (ডাবের জল), অঙ্কুরিত বীজ।

কাজ বা ভূমিকা (Functions):

বৃদ্ধি প্রতিবন্ধক হরমোন (Growth Inhibiting Hormones)

অ্যাবসিসিক অ্যাসিড (Abscisic Acid - ABA)

কাজ বা ভূমিকা:

ইথিলিন (Ethylene)

প্রকৃতি: এটি একমাত্র গ্যাসীয় উদ্ভিদ হরমোন।

কাজ বা ভূমিকা:

কৃত্রিম হরমোনের ব্যবহারিক প্রয়োগ (Practical Application of Synthetic Hormones)

কৃষি ও উদ্যানবিদ্যায় কৃত্রিম হরমোনের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  1. শাখা কলমে মূল উৎপাদন (Rooting in Cuttings): IBA ও NAA নামক কৃত্রিম অক্সিন গোলাপ, আম ইত্যাদি গাছের ডাল বা শাখায় প্রয়োগ করলে দ্রুত মূল গজায়।
  2. আগাছানাশক হিসেবে (As a Weedicide): 2,4-D নামক কৃত্রিম অক্সিন বেশি ঘনত্বে প্রয়োগ করলে তা ধান বা গম ক্ষেতের দ্বিবীজপত্রী আগাছাকে মেরে ফেলে, কিন্তু প্রধান ফসলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না।
  3. বীজবিহীন ফল তৈরি (Parthenocarpy): কৃত্রিম অক্সিন ও জিব্বেরেলিন নিষেক ছাড়াই ফল উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
  4. অকাল পতন রোধ (Preventing Premature Drop): আপেল, লেবু ইত্যাদি ফলের অকালে ঝরে পড়া রোধ করতে NAA ব্যবহার করা হয়।
  5. ফল পাকানো (Fruit Ripening): ইথেফোন নামক রাসায়নিক পদার্থ থেকে নির্গত ইথিলিন কলা, টমেটো ইত্যাদি ফলকে একসঙ্গে ও দ্রুত পাকাতে ব্যবহৃত হয়।