CLASS NO: 02
প্রাথমিক ধারণা: সংবেদনশীলতা, উদ্দীপক ও সাড়া
- সংবেদনশীলতা (Sensitivity): পরিবেশের বিভিন্ন পরিবর্তন শনাক্ত করে সেই অনুযায়ী সাড়া প্রদানের ক্ষমতা হলো জীবের সংবেদনশীলতা। এটি জীবের একটি মৌলিক ধর্ম।
- উদ্দীপক (Stimulus): পরিবেশের যে পরিবর্তন জীবের দেহে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, তাকে উদ্দীপক বলে। এটি বাহ্যিক (আলো, তাপ, স্পর্শ) বা অভ্যন্তরীণ (হরমোন, রসস্ফীতি চাপ) হতে পারে।
- সাড়া (Response): উদ্দীপকের প্রভাবে জীবদেহে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, তাকে সাড়া বলে। উদ্ভিদের ক্ষেত্রে এই সাড়া প্রধানত চলনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর অবদান: তিনিই প্রথম ক্রেসকোগ্রাফ যন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ করেন যে, উদ্ভিদের প্রাণ আছে এবং তারা বাহ্যিক উদ্দীপকের প্রভাবে সাড়া দেয়।
চলন বনাম গমন (Movement vs. Locomotion)
| বৈশিষ্ট্য |
চলন (Movement) |
গমন (Locomotion) |
| সংজ্ঞা |
একস্থানে স্থির থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালন। |
অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালনের মাধ্যমে স্থান পরিবর্তন। |
| উদাহরণ |
প্রায় সমস্ত উদ্ভিদ (কাণ্ডের বৃদ্ধি, পাতা মেলা-বোজা)। |
প্রায় সমস্ত প্রাণী, কিছু এককোষী উদ্ভিদ (ভলভক্স)। |
উদ্ভিদ চলনের শ্রেণিবিভাগ
উদ্ভিদ চলনকে প্রধানত দুটি বৃহৎ ভাগে ভাগ করা হয়:
- স্বতঃস্ফূর্ত চলন (Autonomic Movement): যখন উদ্ভিদের চলন অভ্যন্তরীণ উদ্দীপকের প্রভাবে ঘটে।
- আবিষ্ট বা প্যারটোনিক চলন (Paratonic Movement): যখন উদ্ভিদের চলন বাহ্যিক উদ্দীপকের প্রভাবে ঘটে।
ক) স্বতঃস্ফূর্ত চলন (Autonomic Movement)
১. প্রকরণ চলন (Movement of Variation):
কারণ: কোষের রসস্ফীতি চাপের (Turgor Pressure) পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের ফলে এই চলন ঘটে।
উদাহরণ: বনচাঁড়াল (*Desmodium gyrans*) উদ্ভিদের ত্রিফলক পত্রের পাশের দুটি ছোট পত্রক কোনো বাহ্যিক উদ্দীপক ছাড়াই নিজে থেকে ওঠানামা করে। এটি পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. বৃদ্ধিজনিত চলন (Movement of Growth):
কারণ: বৃদ্ধির সময় কোষের অসম বৃদ্ধির কারণে এই চলন হয়।
উদাহরণ: নুটেশন বা বলন (Nutation): লতানো গাছের কান্ডের আগা বৃদ্ধির সময় সর্পিল আকারে ঘুরতে থাকে।
খ) আবিষ্ট বা প্যারটোনিক চলন (Paratonic Movement)
এটি তিন প্রকারের হয়: ট্যাকটিক, ট্রপিক এবং ন্যাস্টিক।
১. ট্যাকটিক চলন (Tactic Movement)
মূল ধারণা: এটি উদ্ভিদের সামগ্রিক স্থান পরিবর্তন বা গমন। এটি বাহ্যিক উদ্দীপকের গতিপথ বা উৎস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
- ফোটোট্যাকটিক: আলোর প্রভাবে গমন। যেমন— ভলভক্স, ক্ল্যামাইডোমোনাস শৈবালের আলোর দিকে যাওয়া।
- কেমোট্যাকটিক: রাসায়নিক পদার্থের প্রভাবে গমন। যেমন— মস্ ও ফার্নের শুক্রাণু ডিম্বাণুর দিকে গমন করে।
- হাইড্রোট্যাকটিক: জলের প্রভাবে গমন।
- থার্মোট্যাকটিক: উষ্ণতার প্রভাবে গমন।
২. ট্রপিক চলন (Tropic Movement)
মূল ধারণা: এটি উদ্ভিদ অঙ্গের বৃদ্ধিজনিত বক্র চলন। এটি বাহ্যিক উদ্দীপকের গতিপথ বা উৎস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
কৌশল: অক্সিন হরমোন এই চলন নিয়ন্ত্রণ করে। অক্সিন আলোর বিপরীতে এবং অভিকর্ষের দিকে বেশি জমা হয়ে কোষের অসম বৃদ্ধি ঘটায়, ফলে অঙ্গ বেঁকে যায়।
- ফোটোট্রপিক: কাণ্ড ও শাখা আলোর দিকে বৃদ্ধি পায় (অনুকূল), মূল আলোর বিপরীতে বৃদ্ধি পায় (প্রতিকূল)।
- জিওট্রপিক: প্রধান মূল অভিকর্ষের দিকে বৃদ্ধি পায় (অনুকূল), কাণ্ড অভিকর্ষের বিপরীতে বৃদ্ধি পায় (প্রতিকূল)। বিশেষ উদাহরণ: সুন্দরী গাছের শ্বাসমূল (নিউম্যাটোফোর) একটি প্রতিকূল জিওট্রপিক চলন।
- হাইড্রোট্রপিক: মূল সর্বদা জলের উৎসের দিকে বৃদ্ধি পায় (অনুকূল)।
- কেমোট্রপিক: উদাহরণ: পরাগনালির ডিম্বকের দিকে বৃদ্ধি।
- থিগমোট্রপিক: স্পর্শের প্রভাবে ঘটে। উদাহরণ: আকর্ষ (Tendril) কোনো অবলম্বনকে জড়িয়ে ধরে বৃদ্ধি পায়।
৩. ন্যাস্টিক চলন (Nastic Movement)
মূল ধারণা: এটি উদ্ভিদ অঙ্গের রসস্ফীতিজনিত বক্র চলন। এটি বাহ্যিক উদ্দীপকের তীব্রতা (Intensity) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, গতিপথ দ্বারা নয়।
কৌশল: পাতার গোড়ায় অবস্থিত পালভিনাস (Pulvinus) নামক স্ফীত অংশের কোষের রসস্ফীতি চাপের পরিবর্তনের ফলে এই চলন ঘটে।
- ফোটোন্যাস্টি: পদ্ম, সূর্যমুখী বেশি আলোতে ফোটে। শিউলি, জুঁই কম আলোতে ফোটে।
- থার্মোন্যাস্টি: টিউলিপ ফুল বেশি উষ্ণতায় ফোটে।
- সিসমোন্যাস্টি: লজ্জাবতী লতার পাতা স্পর্শ করলে নুয়ে পড়ে।
- কেমোন্যাস্টি: সূর্যশিশির (ড্রসেরা) পতঙ্গের সংস্পর্শে এলে পাতা বা কর্ষিকা পতঙ্গকে আবদ্ধ করে।
- নিকটিন্যাস্টি (Sleep Movement): তেঁতুল, বাবলা গাছের পাতা রাতে মুদে যায়।
পরীক্ষার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য |
ট্রপিক চলন |
ন্যাস্টিক চলন |
| নিয়ন্ত্রক |
উদ্দীপকের গতিপথ |
উদ্দীপকের তীব্রতা |
| প্রকৃতি |
বৃদ্ধিজনিত ও সাধারণত স্থায়ী |
রসস্ফীতিজনিত ও সাধারণত অস্থায়ী |
| হরমোনের প্রভাব |
অক্সিন হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত |
হরমোনের প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই |
| উদাহরণ |
কাণ্ডের আলোর দিকে বৃদ্ধি |
লজ্জাবতীর পাতা স্পর্শে মুড়ে যাওয়া |
এক নজরে পরীক্ষার জন্য মনে রাখার বিষয়
- লজ্জাবতী: সিসমোন্যাস্টি (স্পর্শ)
- বনচাঁড়াল: প্রকরণ চলন (স্বতঃস্ফূর্ত)
- ভলভক্স/ক্ল্যামাইডোমোনাস: ফোটোট্যাকটিক (গমন)
- পদ্ম/সূর্যমুখী (ফোটা): ফোটোন্যাস্টি (আলোর তীব্রতা)
- কাণ্ডের আলোর দিকে বৃদ্ধি: ফোটোট্রপিক (আলোর গতিপথ)
- মূলের মাটির দিকে বৃদ্ধি: জিওট্রপিক (অভিকর্ষ)
- সুন্দরী গাছের শ্বাসমূল: প্রতিকূল জিওট্রপিক
- পতঙ্গভুক উদ্ভিদ (সূর্যশিশির): কেমোন্যাস্টি
- পরাগনালির বৃদ্ধি: কেমোট্রপিক
- টিউলিপ ফুল: থার্মোন্যাস্টি
- আকর্ষ: থিগমোট্রপিক
- উদ্দীপকের তীব্রতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত: ন্যাস্টিক চলন
- উদ্দীপকের গতিপথ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত: ট্রপিক ও ট্যাকটিক চলন
- সামগ্রিক স্থান পরিবর্তন: ট্যাকটিক চলন
- উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা পরিমাপক যন্ত্র: ক্রেসকোগ্রাফ (আবিষ্কারক: জগদীশ চন্দ্র বসু)