অধ্যায়: উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা ও সাড়া প্রদান: চলন

দিন/রাত

CLASS NO: 01

১.১ সংবেদনশীলতা এবং উদ্দীপক (Sensitivity and Stimulus)

জীবের অন্যতম প্রধান ধর্ম হলো উত্তেজনায় সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা। পরিবেশের যে-কোনো পরিবর্তন যা জীবের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, তাকে উদ্দীপক (Stimulus) বলে। যেমন— আলো, তাপ, স্পর্শ, অভিকর্ষ, জল, রাসায়নিক পদার্থ ইত্যাদি। উদ্দীপকের প্রভাবে জীবের সাড়া প্রদানের ক্ষমতাকে সংবেদনশীলতা বা উত্তেজিতা (Sensitivity) বলা হয়।

১.২ উদ্ভিদের সাড়া প্রদান ও জগদীশ চন্দ্র বসুর অবদান

প্রাণীর মতো উদ্ভিদেরও সংবেদনশীলতা আছে। ভারতীয় বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু প্রথম প্রমাণ করেন যে, উদ্ভিদও বাহ্যিক উদ্দীপকের প্রভাবে সাড়া দেয়। তিনি ক্রেসকোগ্রাফ (Crescograph) যন্ত্রের সাহায্যে দেখান যে, উদ্ভিদদেহে সামান্যতম বৃদ্ধি বা চলন পরিমাপ করা সম্ভব। তাঁর গবেষণা লজ্জাবতী, বনচাঁড়াল প্রভৃতি উদ্ভিদকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছিল।

১.৩ চলন ও গমন (Movement and Locomotion)

১.৪ উদ্ভিদ চলনের প্রকারভেদ

উদ্দীপকের প্রকৃতি ও প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভিদের চলনকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:

  1. স্বতঃস্ফূর্ত চলন (Autonomic Movement): অভ্যন্তরীণ উদ্দীপকের প্রভাবে ঘটে।
  2. আবিষ্ট বা প্যারটোনিক চলন (Paratonic Movement): বাহ্যিক উদ্দীপকের প্রভাবে ঘটে।

১.৪.১ স্বতঃস্ফূর্ত চলন (Autonomic Movement)

১. প্রকরণ চলন (Movement of Variation): এটি কোষের রসস্ফীতি চাপের তারতম্যের কারণে সংঘটিত একটি স্বতঃস্ফূর্ত বক্র চলন। উদাহরণ: বনচাঁড়াল (Indian Telegraph Plant) উদ্ভিদের যৌগিক পত্রের তিনটি ফলকের মধ্যে পাশের দুটি ছোটো ফলক দিনের বেলায় কোনো বাহ্যিক উদ্দীপক ছাড়াই পর্যায়ক্রমে ওঠানামা করতে থাকে।

২. বৃদ্ধিজনিত চলন (Movement of Growth): উদ্ভিদ অঙ্গের বৃদ্ধির সময় এই প্রকার স্বতঃস্ফূর্ত চলন দেখা যায়। উদাহরণ: নুটেশন বা বলন (Nutation) লতানো গাছের কান্ডের আগা বৃদ্ধির সময় সর্পিল গতিতে ঘুরতে ঘুরতে বৃদ্ধি পায়।

১.৪.২ আবিষ্ট বা প্যারটোনিক চলন (Paratonic Movement)

বাহ্যিক উদ্দীপকের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এই চলনকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়:

১. ট্যাকটিক চলন (Tactic Movement) বা আবিষ্ট সামগ্রিক চলন

বাহ্যিক উদ্দীপকের প্রভাবে যখন সমগ্র উদ্ভিদদেহ বা তার কোনো অংশ (যেমন— জননকোষ) স্থান পরিবর্তন করে, তখন তাকে ট্যাকটিক চলন বলে। এটিই উদ্ভিদের গমন।

২. ট্রপিক চলন (Tropic Movement) বা দিক্‌নির্ণীত বক্র চলন

বাহ্যিক উদ্দীপকের উৎসের গতিপথ অনুসারে উদ্ভিদ অঙ্গের যে বৃদ্ধিজনিত বক্র চলন হয়, তাকে ট্রপিক চলন বলে।

অক্সিন হরমোনের ভূমিকা: ট্রপিক চলন নিয়ন্ত্রণে অক্সিন হরমোন প্রধান ভূমিকা পালন করে। আলোর প্রভাবে অক্সিন অন্ধকার দিকে এবং অভিকর্ষের প্রভাবে অক্সিন নিচের দিকে স্থানান্তরিত হয়, যা কোষের অসম বৃদ্ধির মাধ্যমে অঙ্গকে বাঁকিয়ে দেয়।

৩. ন্যাস্টিক চলন (Nastic Movement) বা ব্যপ্তিজনিত বক্র চলন

বাহ্যিক উদ্দীপকের গতিপথ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়ে, উদ্দীপকের তীব্রতা (Intensity) দ্বারা উদ্ভিদ অঙ্গের যে রসস্ফীতিজনিত বক্র চলন হয়, তাকে ন্যাস্টিক চলন বলে।

কৌশল: এই চলন সাধারণত উদ্ভিদ অঙ্গের গোড়ায় অবস্থিত পালভিনাস (Pulvinus) নামক স্ফীত অংশের কোষের রসস্ফীতি চাপের (Turgor pressure) পরিবর্তনের ফলে ঘটে।

১.৫ বিভিন্ন প্রকার চলনের মধ্যে পার্থক্য

বৈশিষ্ট্য ট্যাকটিক চলন ট্রপিক চলন ন্যাস্টিক চলন
সংজ্ঞা সামগ্রিক স্থান পরিবর্তন (গমন)। উৎসের গতিপথ-নির্ভর বৃদ্ধিজনিত বক্র চলন। তীব্রতা-নির্ভর রসস্ফীতিজনিত বক্র চলন।
উদ্দীপকের প্রভাব গতিপথ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। গতিপথ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তীব্রতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
হরমোনের ভূমিকা নেই। অক্সিন হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। নেই।
প্রকৃতি এটি গমন। এটি স্থায়ী ও বৃদ্ধিজনিত। এটি অস্থায়ী ও রসস্ফীতিজনিত।