অধ্যায়: অভিব্যক্তি ও অভিযোজন (Evolution & Adaptation)

দিন/রাত

CLASS NO: 01

অধ্যায় ১: অভিব্যক্তি ও জীবনের উৎপত্তি

অভিব্যক্তি কাকে বলে?

অভিব্যক্তি (Evolution): যে মন্থর এবং গতিশীল প্রক্রিয়ায় বংশানুক্রমে উদ্বংশীয় সরলতম সত্তা থেকে নানাপ্রকার পরিবর্তন ও রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে নতুন এবং অপেক্ষাকৃত জটিলতম সত্তার উৎপত্তি ঘটে, তাকে বিবর্তন বা অভিব্যক্তি বলে।

রাসায়নিক ও জৈব অভিব্যক্তি

অধ্যায় ২: জীবনের উৎপত্তি (Origin of Life)

বিজ্ঞানী ওপারিন (1920) এবং হ্যালডেন (1930) মতবাদ দেন যে, আদিম পৃথিবীতে সরল যৌগগুলি বিদ্যুৎশক্তি, অতিবেগুনি রশ্মি ও মহাজাগতিক বিকিরণের প্রভাবে ধীরে ধীরে জটিল জৈব যৌগে পরিণত হয়েছে। তাদের এই মতবাদকে রাসায়নিক বিবর্তনবাদ বলা হয়।

জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তির ধাপসমূহ:

  1. জৈব যৌগের উৎপত্তি:
    • i) হাইড্রোকার্বন সৃষ্টি: আদিম বিজারকধর্মী পরিবেশে (যেখানে মুক্ত অক্সিজেন ছিল না) প্রথম কার্বন যৌগ হিসেবে হাইড্রোকার্বন সৃষ্টি হয়েছিল। যেমন- অ্যাসিটিলিন (C₂H₂), মিথেন (CH₄), ইথিলিন (C₂H₄) ইত্যাদি।
    • ii) কার্বনের অক্সি ও হাইড্রক্সি যৌগ গঠন: হাইড্রোকার্বন উত্তপ্ত জলীয় বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়া করে অক্সি ও হাইড্রক্সি যৌগ—যেমন অ্যালডিহাইড, কিটোন এবং অ্যাসিড তৈরি করে।
    • iii) শর্করা সৃষ্টি: হাইড্রক্সি যৌগগুলি কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন শর্করা (যেমন- গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ) সৃষ্টি করে।
    • iv) স্নেহপদার্থ গঠন: অ্যালডিহাইড ও কিটোন ঘনীভূত হয়ে পলিমার গঠন করে এবং তাদের জারণের ফলে ফ্যাটি অ্যাসিড গঠিত হয়। আদি সমুদ্রে ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারল যুক্ত হয়ে ফ্যাট বা স্নেহপদার্থ সৃষ্টি হয়।
    • v) অ্যামাইনো অ্যাসিড গঠন: হাইড্রোকার্বন যৌগগুলি অ্যামোনিয়া এবং জলের সাহায্যে অ্যামাইনো অ্যাসিড গঠন করে।
  2. জৈব যৌগের মিশ্রণ (গরম তরল স্যুপ):

    বিভিন্ন প্রকার জৈব যৌগ সমুদ্রের গরম জলে মিশে বিজ্ঞানী হ্যালডেনের মতে এক প্রকার "গরম তরল স্যুপ" (Hot Dilute Soup) তৈরি করে।

  3. জটিল যৌগের উৎপত্তি:

    গরম তরল স্যুপের বিভিন্ন সরল জৈব যৌগগুলি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জটিল যৌগ গঠন করে। যেমন- পলিস্যাকারাইড, প্রোটিন, স্নেহপদার্থ, নিউক্লিওসাইড, নিউক্লিওটাইড ইত্যাদি।

  4. নিউক্লিক অ্যাসিড গঠন:

    নিউক্লিওটাইডগুলি যুক্ত হয়ে নিউক্লিক অ্যাসিড (প্রথমে RNA ও পরে DNA) গঠিত হয়।

  5. প্রোটোবায়োন্ট বা প্রোটোসেলের উৎপত্তি:
    • কোয়াসারভেট (Coacervate): বিজ্ঞানী ওপারিনের মতে, প্রোটিনগুলি গরম তরল স্যুপ থেকে আলাদা হয়ে একত্রিত হয়ে কোলয়েড জাতীয় পদার্থ গঠন করে, যাকে কোয়াসারভেট বলে। এটি লিপিড, প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট দ্বারা গঠিত দ্বিস্তরী আবরণযুক্ত একটি সত্তা।
    • মাইক্রোস্ফিয়ার (Microsphere): বিজ্ঞানী সিডনি ফক্সের (1965) মতে, অর্ধভেদ্য পর্দাবেষ্টিত প্রোটিনের গঠন মাইক্রোস্ফিয়ার থেকে প্রথম কোষ সৃষ্টি হয়।
    • এই কোয়াসারভেট বা মাইক্রোস্ফিয়ারের সঙ্গে নিউক্লিক অ্যাসিড যুক্ত হয়ে প্রথম কোষ বা প্রোটোবায়োন্ট/প্রোটোসেল উৎপন্ন হয়েছিল।

মিলার ও ঊরের পরীক্ষা (Miller-Urey Experiment):

বিজ্ঞানী স্ট্যানলি মিলার ও হ্যারোল্ড ঊরে ১৯৫৩ সালে পরীক্ষাগারে আদিম পৃথিবীর পরিবেশ সৃষ্টি করে রাসায়নিক বিবর্তনবাদের সত্যতা প্রমাণ করেন।

অধ্যায় ৩: জৈব অভিব্যক্তির মতবাদ (Theories of Organic Evolution)

ল্যামার্কের মতবাদ বা ল্যামার্কবাদ (Lamarckism)

ফরাসি বিজ্ঞানী জ্যাঁ ব্যাপটিস্ট দ্য মনেট ল্যামার্ক ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর "ফিলোজফি জুওলজিক" (Philosophie Zoologique) নামক গ্রন্থে প্রথম অভিব্যক্তি সংক্রান্ত মতবাদ প্রকাশ করেন।

ল্যামার্কবাদের মূল প্রতিপাদ্য:
  1. পরিবেশের প্রভাব: পরিবেশের পরিবর্তন ঘটলে জীবের স্বভাব ও দেহেরও পরিবর্তন ঘটে।
  2. অঙ্গের ব্যবহার ও অব্যবহারের সূত্র: ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে অঙ্গ সবল ও সুগঠিত হয় এবং অব্যবহারের ফলে অঙ্গ দুর্বল ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে অবশেষে বিলুপ্ত হয়।
  3. অর্জিত বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার সূত্র: জীবের জীবনকালে অর্জিত বৈশিষ্ট্যগুলি বংশপরম্পরায় পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়।
  4. নতুন প্রজাতির উৎপত্তি: অর্জিত বৈশিষ্ট্যের বংশানুসরণের ফলে ধীরে ধীরে একটি প্রজাতি থেকে নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয়।

সপক্ষে উদাহরণ: হাঁসের লিপ্তপদ, জিরাফের লম্বা গলা, সাপের লুপ্তপ্রায় পা।

বিপক্ষে উদাহরণ: বিজ্ঞানী ভাইসম্যান ৩৫ জনু ধরে ইঁদুরের লেজ কেটেও লেজবিহীন ইঁদুর পাননি। ৬০ জনু ধরে ড্রসোফিলা মাছিকে অন্ধকারে রেখেও অন্ধ মাছি তৈরি করা যায়নি।

ডারউইনের মতবাদ বা ডারউইনবাদ (Darwinism)

বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন (1809-1882) ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে "On the Origin of Species by Means of Natural Selection" নামক গ্রন্থে তাঁর যুগান্তকারী মতবাদ প্রকাশ করেন, যা প্রাকৃতিক নির্বাচনবাদ নামে পরিচিত।

ডারউইনবাদের মূল প্রতিপাদ্য:
  1. অত্যধিক হারে বংশবৃদ্ধি: জীবের সহজাত বৈশিষ্ট্য হলো জ্যামিতিক ও গাণিতিক হারে বংশবৃদ্ধি করা।
  2. সীমিত খাদ্য ও বাসস্থান: পৃথিবীর আয়তন সীমিত হওয়ায় খাদ্য ও বাসস্থানও সীমিত।
  3. অস্তিত্বের জন্য জীবন সংগ্রাম: বেঁচে থাকার জন্য জীবকে তিন প্রকার সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়:
    • অন্তঃপ্রজাতিক সংগ্রাম: নিজ প্রজাতির মধ্যে সংগ্রাম।
    • আন্তঃপ্রজাতিক সংগ্রাম: ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে সংগ্রাম।
    • পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রাম: প্রতিকূল পরিবেশের (খরা, বন্যা) বিরুদ্ধে সংগ্রাম।
  4. ভেদ বা প্রকরণ (Variation): দুটি জীবের মধ্যে সর্বদা কিছু পার্থক্য বা ভেদ থাকবেই। এই প্রকরণই বিবর্তনের কাঁচামাল।
  5. যোগ্যতমের ঊর্ধ্বর্তন (Survival of the Fittest): জীবন সংগ্রামে সেই সমস্ত জীবই জয়ী হয় যাদের দেহে সহায়ক অভিযোজনমূলক বৈশিষ্ট্য থাকে।
  6. প্রাকৃতিক নির্বাচন (Natural Selection): যে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় অনুকূল ভেদযুক্ত জীবেরা প্রতিযোগিতায় বেশি সুবিধা পায় এবং প্রকৃতি দ্বারা নির্বাচিত হয়, তাকে প্রাকৃতিক নির্বাচন বলে।
  7. নতুন প্রজাতির উৎপত্তি: অনুকূল প্রকরণগুলি বংশপরম্পরায় পুঞ্জীভূত হয়ে কালক্রমে একটি নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটায়।

ডারউইনবাদের ত্রুটি: তিনি প্রকরণের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে পারেননি। তিনি নিষ্ক্রিয় অঙ্গের উপস্থিতি ব্যাখ্যা করতে পারেননি। তিনি মিউটেশনকে 'প্রকৃতির খেলা' বলে উপেক্ষা করেছেন।

ল্যামার্কবাদ ও ডারউইনবাদের পার্থক্য:

বিষয় ল্যামার্কবাদ ডারউইনবাদ
মূল ভিত্তি অর্জিত বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার এবং অঙ্গের ব্যবহার-অব্যবহার। প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম।
প্রকরণের ভূমিকা পরিবেশের প্রভাবে জীব বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। প্রকরণ আগে থেকেই জীবগোষ্ঠীতে উপস্থিত থাকে।
নিষ্ক্রিয় অঙ্গ অঙ্গের অব্যবহারের ফলে নিষ্ক্রিয় অঙ্গের সৃষ্টি হয়। এই মতবাদে নিষ্ক্রিয় অঙ্গের কোনো ব্যাখ্যা নেই।

অধ্যায় ৪: অভিব্যক্তির সপক্ষে প্রমাণ (Evidence for Evolution)

১. তুলনামূলক শারীরস্থানগত প্রমাণ (Evidence from Comparative Anatomy):

২. জীবাশ্মঘটিত প্রমাণ (Evidence from Fossils):

৩. ভ্রূণতত্ত্বগত প্রমাণ (Evidence from Embryology):

বিজ্ঞানী আর্নস্ট হেকেল-এর বায়োজেনেটিক সূত্র অনুযায়ী, "ব্যক্তিজনি জাতিজনিকে পুনরাবর্তন করে (Ontogeny repeats Phylogeny)"

অর্থাৎ, একটি জীবের ভ্রূণের বিকাশের সময় তার পূর্বপুরুষদের বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ফুটে ওঠে। বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণীর (মাছ, স্যালামান্ডার, কচ্ছপ, মুরগি, মানুষ) ভ্রূণের প্রাথমিক অবস্থায় গলবিলীয় ফুলকা খাঁজ, লেজসদৃশ গঠন ইত্যাদির উপস্থিতি দেখা যায়, যা তাদের সাধারণ পূর্বপুরুষের অস্তিত্ব প্রমাণ করে।

৪. মেরুদণ্ডী প্রাণীদের হৃৎপিণ্ডের গঠনগত প্রমাণ:

মাছ (২-প্রকোষ্ঠ), উভচর (৩-প্রকোষ্ঠ), সরীসৃপ (অসম্পূর্ণ ৪-প্রকোষ্ঠ) থেকে পক্ষী ও স্তন্যপায়ী (সম্পূর্ণ ৪-প্রকোষ্ঠ) প্রাণীদের হৃৎপিণ্ডের গঠন পর্যালোচনা করলে সরল থেকে জটিল গঠনের দিকে অভিব্যক্তির ধারা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।