CLASS NO: 02
ভূমিকা: ইকোলজি ও বাস্তুতন্ত্র
- ইকোলজি (Ecology): বিজ্ঞানের যে শাখায় জীব (Organism) ও তার পারিপার্শ্বিক জড় ও সজীব পরিবেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক বা আন্তঃক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে ইকোলজি বা বাস্তুবিদ্যা বলে।
- গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: জার্মান বিজ্ঞানী আর্নস্ট হেকেল (Ernst Haeckel) 1866 সালে সর্বপ্রথম গ্রিক শব্দ 'Oikos' (বাসস্থান) এবং 'Logos' (জ্ঞান) থেকে 'Ecology' শব্দটি চয়ন করেন এবং এর কার্যকরী সংজ্ঞা দেন।
- বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem): কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের জীবগোষ্ঠী (Biotic Community) এবং তার পারিপার্শ্বিক জড় পরিবেশের (Abiotic Environment) মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং পদার্থ ও শক্তি বিনিময়ের ফলে যে কার্যকরী একক গঠিত হয়, তাকে বাস্তুতন্ত্র বলে।
- গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ব্রিটিশ বিজ্ঞানী এ. জি. ট্যান্সলে (A. G. Tansley) 1935 সালে সর্বপ্রথম 'Ecosystem' শব্দটি ব্যবহার বা প্রবর্তন করেন।
- বায়োস্ফিয়ার (Biosphere): পৃথিবীর জল, স্থল এবং বায়ুমণ্ডলের যে অংশে জীবের অস্তিত্ব আছে, সেই সমগ্র অংশকে একত্রে বায়োস্ফিয়ার বা জীবমণ্ডল বলে। এটিই পৃথিবীর বৃহত্তম বাস্তুতন্ত্রের উদাহরণ, যার মধ্যে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র (Marine Ecosystem) সর্ববৃহৎ।
১. বাস্তুতন্ত্রের উপাদান (Components of Ecosystem)
বাস্তুতন্ত্রের উপাদানগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:
(ক) জড় উপাদান (Abiotic Components)
পরিবেশের সমস্ত প্রাণহীন উপাদান।
- ভৌত উপাদান (Physical Factors): যেমন - সূর্যালোক, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ ইত্যাদি। (আলো মানবদেহের ত্বকে মেলানিন উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে)।
- অজৈব উপাদান (Inorganic Substances): যেমন - জল (H₂O), অক্সিজেন (O₂), কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂), নাইট্রোজেন, ফসফরাস, কপার (Cu, একটি মাইক্রো পরিপোষক), অক্সিজেন (O₂, একটি ম্যাক্রো পরিপোষক)।
- জৈব উপাদান (Organic Substances): যেমন - কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, প্রোটিন, হিউমাস ইত্যাদি। এগুলি মৃত জীবদেহ থেকে সৃষ্টি হয়।
(খ) সজীব উপাদান (Biotic Components)
বাস্তুতন্ত্রের সমস্ত জীবন্ত উপাদান।
- উৎপাদক (Producer):
- এরা স্বভোজী (Autotrophs), যারা সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে খাদ্য তৈরি করে। খাদ্যশৃঙ্খলের সূচনা এদের দ্বারাই হয়।
- উদাহরণ: সমস্ত সবুজ উদ্ভিদ, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন (জলজ বাস্তুতন্ত্রের উৎপাদক)।
- খাদক (Consumer):
- এরা পরভোজী (Heterotrophs) এবং খাদ্যের জন্য উৎপাদকের উপর নির্ভরশীল।
- প্রথম শ্রেণির খাদক (Primary Consumers): এরা সরাসরি উৎপাদককে খায়। এদের তৃণভোজী বা শাকাশী (Herbivores) বলে। উদাহরণ: পতঙ্গ, গবাদি পশু, ছাগল, হরিণ, খরগোশ, জুপ্ল্যাঙ্কটন।
- দ্বিতীয় শ্রেণির খাদক (Secondary/Gouono Consumers): এরা প্রথম শ্রেণির খাদকদের খায়। এরা মাংসাশী হয়। উদাহরণ: ব্যাঙ (পতঙ্গ খায়), শিয়াল, ছোট মাছ।
- প্রগৌণ বা তৃতীয় শ্রেণির খাদক (Tertiary Consumers): এরা দ্বিতীয় শ্রেণির খাদকদের খায়। উদাহরণ: সাপ (ব্যাঙ খায়), বাঘ (হরিণ বা শিয়াল খায়, তাই বাঘ দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির খাদক হতে পারে)।
- সর্বভুক (Omnivores): এরা উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয়কেই খায়। উদাহরণ: মানুষ, ভালুক।
- বিয়োজক (Decomposer):
- এরা মৃতজীবী (Saprotrophs)। এরা মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহকে ভেঙে সরল অজৈব উপাদানে পরিণত করে পরিবেশে ফিরিয়ে দেয়।
- উদাহরণ: ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক।
উদ্ভিদ ও প্রাণীজগত: কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমগ্র উদ্ভিদকূলকে ফ্লোরা (Flora) এবং প্রাণীকূলকে ফনা (Fauna) বলা হয়।
২. বাস্তুতন্ত্রের কার্যকারিতা (Functions of Ecosystem)
ক) খাদ্যশৃঙ্খল ও খাদ্যজাল (Food Chain and Food Web)
- খাদ্যশৃঙ্খল (Food Chain): উৎপাদক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণির খাদকের মধ্যে শক্তিপ্রবাহের সরলরৈখিক পথকে খাদ্যশৃঙ্খল বলে। সাধারণত একটি খাদ্যশৃঙ্খলে 3 থেকে 5টি পুষ্টিস্তর (Trophic Level) থাকে। বিজ্ঞানী ইউজিন ওডাম (Eugene Odum) 1966 সালে খাদ্যশৃঙ্খলের বিজ্ঞানভিত্তিক সংজ্ঞা দেন।
- গ্রেজিং খাদ্যশৃঙ্খল: সবুজ উদ্ভিদ (উৎপাদক) থেকে শুরু হয়। উদাহরণ: ঘাস → ঘাসফড়িং → ব্যাঙ → সাপ → ময়ূর।
- খাদ্যজাল (Food Web): কোনো বাস্তুতন্ত্রের একাধিক পরস্পর সম্পর্কযুক্ত খাদ্যশৃঙ্খল দ্বারা গঠিত জালের মতো গঠনকে খাদ্যজাল বলে।
খ) শক্তিপ্রবাহ (Energy Flow)
- বাস্তুতন্ত্রে শক্তির মূল উৎস সূর্যালোক।
- শক্তিপ্রবাহ সর্বদা একমুখী (Unidirectional) হয়, অর্থাৎ উৎপাদক থেকে খাদকের দিকে যায়, কিন্তু ফিরে আসে না।
- বাস্তুতন্ত্রে শক্তিপ্রবাহের একক হলো কিলোক্যালোরি (Kilocalorie)।
- লিন্ডেম্যানের দশ শতাংশের সূত্র (Lindemann's 10% Law): 1942 সালে বিজ্ঞানী রেমন্ড লিন্ডেম্যান (Raymond Lindemann) এই সূত্র দেন। সূত্রানুযায়ী, একটি পুষ্টিস্তর থেকে পরবর্তী পুষ্টিস্তরে মাত্র 10% শক্তি স্থানান্তরিত হয়।
- উদাহরণ: একটি হরিণ যদি 10 কেজি উদ্ভিদ খায়, তার দেহে 1 কেজি শক্তি সঞ্চিত হয়। আবার একটি বাঘ যদি সেই 10 কেজি মাংসের হরিণকে খায়, তবে তার দেহ গঠনের জন্য 10 কেজির 10% অর্থাৎ 1 কেজি মাংস কাজে লাগবে।
গ) ইকোলজিক্যাল পিরামিড (Ecological Pyramid)
- বাস্তুতন্ত্রের পুষ্টিস্তরগুলির গঠনকে (সংখ্যা, জীবভর বা শক্তি) পর্যায়ক্রমে সাজালে যে পিরামিডের মতো কাঠামো তৈরি হয়, তাকে ইকোলজিক্যাল পিরামিড বলে। এর ধারণা দেন বিজ্ঞানী চার্লস এলটন (Charles Elton)।
- সংখ্যার পিরামিড: সাধারণত সোজা হয়। কিন্তু পরজীবী খাদ্যশৃঙ্খলে (Parasitic Food Chain) এটি উল্টানো (Inverted) হয়।
- জীবভরের পিরামিড: সাধারণত সোজা হয়। কিন্তু জলজ বাস্তুতন্ত্রে এটি উল্টানো হয়।
- שক্তির পিরামিড: এটি সর্বদা সোজা (Always Upright) হয়, কারণ প্রতিটি স্তরে শক্তি হ্রাস পায়। এর সবচেয়ে নীচে থাকে উৎপাদক।
৩. পপুলেশন ইকোলজি (Population Ecology)
- পপুলেশন (Population): কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বসবাসকারী একই প্রজাতির জীবগোষ্ঠী।
- জন্মহার (Birth Rate, B): B = nb/N (যেখানে nb = নতুন জন্মানো অপত্য সংখ্যা, N = মোট জীবসংখ্যা)। জন্মহার পপুলেশনের আকার বৃদ্ধি করে।
- মৃত্যুহার (Death Rate, D): D = nd/N (যেখানে nd = মৃত সদস্য সংখ্যা, N = মোট জীবসংখ্যা)। মৃত্যুহার পপুলেশনের আকার হ্রাস করে।
- পপুলেশন পিরামিড: জীবের বয়সের উপর ভিত্তি করে গঠিত হয়।
৪. পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কিত বিষয়
- জলজ বাস্তুতন্ত্রের জীব:
- প্ল্যাঙ্কটন (Plankton): জলে ভাসমান আণুবীক্ষণিক জীব।
- নেকটন (Nekton): জলে সক্রিয়ভাবে সাঁতার কাটতে সক্ষম প্রাণী (যেমন- মাছ)।
- নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ: অ্যাজোটোব্যাকটর (Azotobacter) একটি নাইট্রোজেন স্থিতিকারী ব্যাকটেরিয়া।
- পরিবেশ দূষণ ও রোগ:
- মিনামাটা রোগ (Minamata Disease): পারদ (Mercury) দূষণের ফলে হয়।
- ইটাই-ইটাই রোগ (Itai-Itai Disease): ক্যাডমিয়াম (Cadmium) দূষণের ফলে হয়।
- ব্ল্যাক ফুট ডিজিজ (Black Foot Disease): আর্সেনিক দূষণের ফলে হয়।
- বায়ুমণ্ডল ও দূষণ:
- বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে থাকা ওজোন (O₃) স্তর সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি থেকে জীবজগৎকে রক্ষা করে।
- অ্যাসিড বৃষ্টি (Acid Rain): বায়ুদূষণের ফলে সৃষ্ট অ্যাসিড বৃষ্টি মার্বেল পাথরের ক্ষতি করে, যাকে 'মার্বেল ক্যানসার' বলা হয়। তাজমহল এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত।
- বিশ্ব পরিবেশ দিবস (World Environment Day): প্রতি বছর 5ই জুন পালন করা হয়।