CLASS NO: 01
ভূমিকা
আমাদের চারপাশে থাকা সজীব ও জড় উপাদান একে অপরের উপর নির্ভরশীল এবং এদের মধ্যে অনবরত শক্তি ও পদার্থের আদানপ্রদান চলে। জীবমন্ডলের যে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসবাসকারী জীব সম্প্রদায় (Biotic Community) এবং সেখানকার জড় পরিবেশের (Abiotic Environment) পারস্পরিক আন্তঃক্রিয়ার মাধ্যমে যে কার্যকরী একক গঠিত হয়, তাকে বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) বলে।
- ইকোলজি (Ecology): বিজ্ঞানের যে শাখায় জীব ও পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে ইকোলজি বা বাস্তুবিদ্যা বলে। জার্মান বিজ্ঞানী আর্নস্ট হেকেল (Ernst Haeckel) প্রথম 'Ecology' শব্দটি ব্যবহার করেন।
- ইকোসিস্টেম (Ecosystem): 1935 সালে বিজ্ঞানী এ. জি. ট্যান্সলে (A. G. Tansley) সর্বপ্রথম 'Ecosystem' শব্দটি প্রবর্তন করেন।
১. বাস্তুতন্ত্রের উপাদান (Components of Ecosystem)
বাস্তুতন্ত্রের উপাদানগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:
- জড় উপাদান (Abiotic Components)
- সজীব উপাদান (Biotic Components)
(ক) জড় উপাদান (Abiotic Components)
পরিবেশের প্রাণহীন বা জড় উপাদানগুলিকে একত্রে জড় উপাদান বলা হয়। এগুলি তিন প্রকারের হয়:
- ভৌত উপাদান (Physical Factors): যেমন - সূর্যালোক, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ, বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ইত্যাদি। এগুলি জীবের বেঁচে থাকা এবং কার্যকলাপকে নিয়ন্ত্রণ করে।
- অজৈব উপাদান (Inorganic Substances): যেমন - জল (H₂O), কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂), অক্সিজেন (O₂), নাইট্রোজেন (N₂), ক্যালসিয়াম (Ca), ফসফরাস (P) ইত্যাদি। এগুলি পুষ্টিচক্রের মাধ্যমে জীবদেহে প্রবেশ করে।
- জৈব উপাদান (Organic Substances): যেমন - কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, হিউমাস ইত্যাদি। এগুলি মৃত জীবদেহ বা রেচন পদার্থ পচে তৈরি হয় এবং মাটির উর্বরতা বাড়ায়।
(খ) সজীব উপাদান (Biotic Components)
বাস্তুতন্ত্রের সমস্ত জীবন্ত উপাদানকে একত্রে সজীব উপাদান বলে। পুষ্টির প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে এদের তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:
- উৎপাদক (Producer):
- এরা হলো স্বভোজী (Autotrophs)। অর্থাৎ, এরা নিজেদের খাদ্য নিজেরাই তৈরি করতে পারে।
- সবুজ উদ্ভিদ, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন, এবং কিছু ব্যাকটেরিয়া সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৌরশক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে খাদ্য তৈরি করে।
- এরাই বাস্তুতন্ত্রের সমস্ত শক্তির মূল উৎস এবং খাদ্যশৃঙ্খলের প্রথম স্তরে অবস্থান করে।
- খাদক (Consumer):
- এরা হলো পরভোজী (Heterotrophs)। খাদ্যের জন্য এরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উৎপাদকের উপর নির্ভরশীল।
- খাদ্যাভ্যাসের ভিত্তিতে খাদকদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:
- প্রথম শ্রেণির খাদক বা প্রাথমিক খাদক (Primary Consumers): এরা সরাসরি উৎপাদককে (উদ্ভিদ) খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এদের তৃণভোজী (Herbivores) বলা হয়। উদাহরণ: গরু, ছাগল, হরিণ, পতঙ্গ, জুপ্ল্যাঙ্কটন ইত্যাদি।
- দ্বিতীয় শ্রেণির খাদক বা গৌণ খাদক (Secondary Consumers): এরা প্রাথমিক খাদকদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এরা সাধারণত মাংসাশী (Carnivores) হয়। উদাহরণ: ব্যাঙ (পতঙ্গ খায়), শিয়াল (খরগোশ খায়), ছোট মাছ (জুপ্ল্যাঙ্কটন খায়) ইত্যাদি।
- তৃতীয় শ্রেণির খাদক বা প্রগৌণ খাদক (Tertiary Consumers): এরা দ্বিতীয় শ্রেণির খাদকদের শিকার করে খায়। এরাও মাংসাশী। উদাহরণ: সাপ (ব্যাঙ খায়), বাঘ (শিয়াল খায়), বড় মাছ (ছোট মাছ খায়) ইত্যাদি।
- সর্বোচ্চ খাদক (Top Consumers): এরা খাদ্যশৃঙ্খলের সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করে এবং সাধারণত অন্য কোনো প্রাণী এদের শিকার করে না। উদাহরণ: বাঘ, সিংহ, ঈগল, মানুষ ইত্যাদি।
- সর্বভুক (Omnivores): এরা উৎপাদক (উদ্ভিদ) এবং খাদক (প্রাণী) উভয়কেই খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। উদাহরণ: মানুষ, ভালুক, কাক ইত্যাদি।
- বিয়োজক (Decomposer):
- এরা মৃতজীবী (Saprotrophs)। মৃত উৎপাদক এবং সমস্ত শ্রেণির খাদকের মৃতদেহ বা তাদের রেচন পদার্থের উপর এরা ক্রিয়া করে।
- এরা জটিল জৈব যৌগগুলিকে ভেঙে সরল অজৈব যৌগে রূপান্তরিত করে, যা পুনরায় উৎপাদকের ব্যবহারের জন্য পরিবেশে ফিরে আসে।
- এদের "পরিবেশের পরিচ্ছন্নতাকর্মী" (Scavengers of Nature) বলা হয়।
- উদাহরণ: ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাক।
২. বাস্তুতন্ত্রের কার্যকারিতা (Functions of Ecosystem)
(ক) খাদ্যশৃঙ্খল (Food Chain)
বাস্তুতন্ত্রে উৎপাদক থেকে শক্তি যখন বিভিন্ন খাদকের মধ্যে ধাপে ধাপে স্থানান্তরিত হয়, তখন সেই সরলরৈখিক পথকে খাদ্যশৃঙ্খল বলে।
উদাহরণ: ঘাস (উৎপাদক) → ঘাসফড়িং (প্রাথমিক খাদক) → ব্যাঙ (গৌণ খাদক) → সাপ (প্রগৌণ খাদক) → ময়ূর (সর্বোচ্চ খাদক)।
(খ) খাদ্যজাল (Food Web)
কোনো বাস্তুতন্ত্রে একাধিক খাদ্যশৃঙ্খল যখন সম্পর্কযুক্ত হয়ে একটি জালের মতো গঠন তৈরি করে, তখন তাকে খাদ্যজাল বলে। খাদ্যজাল খাদ্যশৃঙ্খলের চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল।
(গ) পুষ্টিস্তর (Trophic Level)
খাদ্যশৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপকে পুষ্টিস্তর বলে।
- প্রথম পুষ্টিস্তর: উৎপাদক (সবুজ উদ্ভিদ)
- দ্বিতীয় পুষ্টিস্তর: প্রাথমিক খাদক (তৃণভোজী)
- তৃতীয় পুষ্টিস্তর: গৌণ খাদক (মাংসাশী)
- চতুর্থ পুষ্টিস্তর: প্রগৌণ খাদক (উচ্চ মাংসাশী)
(ঘ) শক্তিপ্রবাহ (Energy Flow)
- বাস্তুতন্ত্রে শক্তির মূল উৎস হলো সূর্য।
- শক্তিপ্রবাহ সর্বদা একমুখী (Unidirectional) হয়। অর্থাৎ, শক্তি উৎপাদক থেকে সর্বোচ্চ খাদকের দিকে প্রবাহিত হয় কিন্তু ফিরে আসে না।
- লিন্ডেম্যানের দশ শতাংশের সূত্র (Lindemann's 10% Law): 1942 সালে বিজ্ঞানী রেমন্ড লিন্ডেম্যান এই সূত্রটি দেন। এই সূত্র অনুযায়ী, খাদ্যশৃঙ্খলের একটি পুষ্টিস্তর থেকে পরবর্তী পুষ্টিস্তরে শক্তি স্থানান্তরের সময় প্রায় 90% শক্তি তাপশক্তি হিসেবে নষ্ট হয় এবং মাত্র 10% শক্তি জীবদেহে সঞ্চিত থাকে।
- উদাহরণ: যদি উৎপাদকের (ঘাস) সঞ্চিত শক্তি 10,000 kcal হয়, তবে -
- প্রাথমিক খাদক (হরিণ) পাবে 10,000 এর 10% = 1000 kcal
- গৌণ খাদক (বাঘ) পাবে 1000 এর 10% = 100 kcal
(ঙ) ইকোলজিক্যাল পিরামিড (Ecological Pyramid)
বাস্তুতন্ত্রের পুষ্টিস্তরগুলিকে পর্যায়ক্রমে সাজালে যে পিরামিড আকৃতির কাঠামো তৈরি হয়, তাকে ইকোলজিক্যাল পিরামিড বলে। এর ধারণা দেন বিজ্ঞানী চার্লস এলটন (Charles Elton)। এটি তিন প্রকারের:
- সংখ্যার পিরামিড (Pyramid of Numbers): এটি সাধারণত সোজা (Upright) হয়। তবে পরজীবী খাদ্যশৃঙ্খলে (যেমন একটি গাছে অনেক পাখি) এটি উল্টানো (Inverted) হয়।
- জীবভরের পিরামিড (Pyramid of Biomass): এটিও সাধারণত সোজা হয়। তবে জলজ বাস্তুতন্ত্রে এটি উল্টানো হয়, কারণ উৎপাদক ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের মোট জীবভর খাদক জুপ্ল্যাঙ্কটনের চেয়ে কম।
- শক্তির পিরামিড (Pyramid of Energy): শক্তির পিরামিড সর্বদা সোজা (Always Upright) হয়, কারণ প্রতিটি পুষ্টিস্তরে শক্তি কমে যায়।
(চ) জৈব-ভূ-রাসায়নিক চক্র (Biogeochemical Cycle)
যে চক্রাকার পথে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান (যেমন- কার্বন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস) জীবদেহ থেকে পরিবেশে এবং পরিবেশ থেকে পুনরায় জীবদেহে আবর্তিত হয়, তাকে জৈব-ভূ-রাসায়নিক চক্র বলে। এর মাধ্যমে পুষ্টির ভারসাম্য বজায় থাকে।
- উদাহরণ: কার্বন চক্র, নাইট্রোজেন চক্র, জল চক্র ইত্যাদি।