ভূমিকা
মানবদেহের যে তন্ত্রের মাধ্যমে রক্ত সারা শরীরে সঞ্চালিত হয়ে প্রতিটি কোষে অক্সিজেন, পুষ্টি, হরমোন পৌঁছে দেয় এবং কোষ থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও বর্জ্য পদার্থ সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট অঙ্গে প্রেরণ করে, তাকে রক্ত সংবহনতন্ত্র (Circulatory System) বলে। ইংরেজ চিকিৎসক উইলিয়াম হার্ভে (William Harvey) প্রথম এই তন্ত্রের সঠিক কার্যকারিতা আবিষ্কার করেন।
সংবহনতন্ত্র মূলত তিনটি প্রধান উপাদান নিয়ে গঠিত:
- হৃৎপিণ্ড (Heart) - পাম্প যন্ত্র
- রক্তনালী (Blood Vessels) - পরিবহনের পথ
- রক্ত (Blood) - পরিবহনের মাধ্যম
1. হৃৎপিণ্ড (The Heart)
অবস্থান ও ওজন:
- অবস্থান: হৃৎপিণ্ড বক্ষগহ্বরের মাঝখানে, দুটি ফুসফুসের মধ্যবর্তী স্থানে, সামান্য বাম দিকে ঘেঁষে অবস্থিত। এই বিশেষ স্থানটিকে মিডিয়াস্টিনাম (Mediastinum) বলা হয়।
- ওজন: একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হৃৎপিণ্ডের গড় ওজন প্রায় 300 গ্রাম।
গঠন ও প্রকোষ্ঠ:
মানব হৃৎপিণ্ড চারটি প্রকোষ্ঠে (Chambers) বিভক্ত।
- উপরের দুটি প্রকোষ্ঠ: ডান অলিন্দ এবং বাম অলিন্দ।
- নিচের দুটি প্রকোষ্ঠ: ডান নিলয় এবং বাম নিলয়।
মাছ: 2টি প্রকোষ্ঠ (1টি অলিন্দ, 1টি নিলয়)।
সরীসৃপ (কুমির ব্যতীত): 3টি প্রকোষ্ঠ।
কুমির, পাখি ও স্তন্যপায়ী: 4টি প্রকোষ্ঠ।
কপাটিকা (Valves):
রক্তের একমুখী প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য হৃৎপিণ্ডে কপাটিকা থাকে।
- বাইকাসপিড বা মাইট্রাল কপাটিকা: বাম অলিন্দ ও বাম নিলয়ের সংযোগস্থলে থাকে।
- ট্রাইকাসপিড কপাটিকা: ডান অলিন্দ ও ডান নিলয়ের সংযোগস্থলে থাকে।
হৃৎপিণ্ডের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ও হৃদস্পন্দন:
- সাইনোট্রিয়াল নোড (SA Node): এটি হৃৎপিণ্ডের ডান অলিন্দের প্রাচীরে অবস্থিত। এটি বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করে হৃৎস্পন্দন শুরু করে, তাই একে হৃৎপিণ্ডের 'প্রাকৃতিক পেসমেকার' (Natural Pacemaker) বলা হয়।
- হার্টবিট বা হৃদস্পন্দন: একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বিশ্রামের সময় হৃদস্পন্দনের হার প্রতি মিনিটে 60 থেকে 100 বার।
- পালস (Pulse): হৃৎস্পন্দনের ফলে ধমনীর প্রাচীরে যে চাপ সৃষ্টি হয় এবং ঢেউয়ের মতো সঞ্চালিত হয়, তাকে পালস বলে।
2. রক্তনালী (Blood Vessels)
ধমনী (Artery):
যেসব রক্তনালী হৃৎপিণ্ড থেকে রক্ত দেহের বিভিন্ন অংশে বহন করে নিয়ে যায়, তাদের ধমনী বলে। এরা সাধারণত অক্সিজেন-সমৃদ্ধ বিশুদ্ধ রক্ত পরিবহন করে (ব্যতিক্রম: ফুসফুসীয় ধমনী, যা কার্বন ডাইঅক্সাইডযুক্ত রক্ত পরিবহন করে)।
শিরা (Vein):
যেসব রক্তনালী দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত হৃৎপিণ্ডে ফিরিয়ে আনে, তাদের শিরা বলে। এরা সাধারণত কার্বন ডাইঅক্সাইড-সমৃদ্ধ দূষিত রক্ত পরিবহন করে (ব্যতিক্রম: ফুসফুসীয় শিরা, যা অক্সিজেনযুক্ত রক্ত পরিবহন করে)।
কৈশিক জালিকা (Capillaries):
এরা সূক্ষ্মতম রক্তনালী যা ধমনী ও শিরার সংযোগ স্থাপন করে এবং কোষের সাথে গ্যাস ও পুষ্টির আদান-প্রদান ঘটায়।
3. রক্ত (Blood)
রক্তের প্রকৃতি ও পরিমাণ:
- রক্ত এক প্রকার তরল যোজক কলা (Liquid Connective Tissue)।
- এর স্বাদ নোনতা এবং এটি সামান্য ক্ষারীয় প্রকৃতির। এর স্বাভাবিক pH মান 7.35 থেকে 7.45।
- একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দেহে তার মোট ওজনের প্রায় 7-8% রক্ত থাকে, যা পরিমাণে প্রায় 5-6 লিটার।
- সারা দেহে একবার রক্ত সংবহন হতে প্রায় 23 সেকেন্ড সময় লাগে।
রক্তের উপাদান:
রক্তের প্রধান দুটি উপাদান হলো রক্তরস এবং রক্তকণিকা।
- ক) রক্তরস (Plasma): এটি রক্তের তরল অংশ (প্রায় 55%)। এর প্রধান কাজ খাদ্যসার, কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂), হরমোন এবং বর্জ্য পরিবহন করা।
- খ) রক্তকণিকা (Blood Corpuscles): এরা তিন প্রকারের হয়:
- লোহিত রক্তকণিকা (RBC):
- কাজ: এর প্রধান কাজ হিমোগ্লোবিন-এর সাহায্যে ফুসফুস থেকে দেহের সমস্ত কোষে অক্সিজেন সরবরাহ করা।
- গঠন: পরিণত RBC-তে নিউক্লিয়াস ও মাইটোকন্ড্রিয়া থাকে না।
- হিমোগ্লোবিন: এটি একটি লৌহঘটিত প্রোটিন, যার জন্য রক্তের রঙ লাল হয়।
- জীবনকাল: 115-120 দিন।
- শ্বেত রক্তকণিকা (WBC):
- কাজ: এরা রোগজীবাণু ধ্বংস করে শরীরকে সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে। তাই এদের 'দেহের সৈনিক' বলা হয়।
- গঠন: এদের নির্দিষ্ট আকার নেই এবং এরা নিউক্লিয়াসযুক্ত।
- মনোসাইট (Monocyte) হলো আকারের দিক থেকে বৃহত্তম রক্তকণিকা।
- অনুচক্রিকা (Platelets):
- কাজ: কেটে যাওয়া স্থানে রক্ত জমাট বাঁধতে বা রক্ত তঞ্চনে সাহায্য করে।
4. রক্ত তঞ্চন (Blood Clotting)
- প্রক্রিয়া: কোনো স্থান কেটে গেলে অনুচক্রিকা এবং প্লাজমার ফাইব্রিনোজেন ও প্রোথ্রোমবিন নামক প্রোটিন রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।
- সময়: স্বাভাবিক রক্তপাতের সময় (Bleeding Time) 2-7 মিনিট এবং জমাট বাঁধার সময় (Clotting Time) 3-10 মিনিট।
- হেপারিন (Heparin): এটি একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিকোঅ্যাগুল্যান্ট যা রক্তনালীর ভেতরে রক্তকে জমাট বাঁধতে দেয় না।
5. রক্তচাপ (Blood Pressure)
- রক্ত প্রবাহের সময় ধমনীর প্রাচীরে যে চাপ সৃষ্টি হয়, তাকে রক্তচাপ বলে।
- পরিমাপক যন্ত্র: রক্তচাপ মাপার যন্ত্রের নাম স্ফিগমোম্যানোমিটার (Sphygmomanometer)।
- স্বাভাবিক মান: একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্বাভাবিক রক্তচাপ হলো 120/80 mm Hg।
- সিস্টোলিক চাপ (120 mm Hg): হৃৎপিণ্ডের সংকোচনের সময় সর্বোচ্চ চাপ।
- ডায়াস্টোলিক চাপ (80 mm Hg): হৃৎপিণ্ডের প্রসারণের সময় সর্বনিম্ন চাপ।
6. রক্তের গ্রুপ (Blood Group)
- আবিষ্কারক: বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার 1900 সালে A, B এবং O ব্লাড গ্রুপ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।
- ABO সিস্টেম: মানুষের রক্তের প্রধান গ্রুপ চারটি— A, B, AB, এবং O। 'C' নামে কোনো রক্তের গ্রুপ নেই।
- Rh ফ্যাক্টর: এটি লোহিত কণিকায় থাকা এক ধরনের অ্যান্টিজেন, যা প্রথম রেসাস (Rhesus) বানরের রক্তে পাওয়া গিয়েছিল।
সর্বজনীন দাতা (Universal Donor): O নেগেটিভ (O-) গ্রুপের রক্ত সবাইকে দেওয়া যায়।
সর্বজনীন গ্রহীতা (Universal Recipient): AB পজিটিভ (AB+) গ্রুপের রক্ত সবার থেকে গ্রহণ করা যায়।